-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
আজ ভয়াল ১২ নভেম্বর: উপকূলবাসীর শোকের দিন
১৯৭০ সালের এই দিনে সমগ্র উপকূল জুড়ে বয়ে যায় মহা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। ১০ নং মহাবিপদ সংকেত বুঝতে না পারার খেসারত দিতে হয়েছে উপকূলবাসীর প্রাণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে।
প্রবল জোয়ারের স্রোতে ভেসে যায় গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় পশু-পাখি, ফসল ও অসংখ্য গাছপাল। পুরো উপকূল মুহূর্তেই ধ্বংসজজ্ঞে পরিণত হয়। চারদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে লাশ আর লাশ। বাতাসে লাশের গন্ধ আর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে উপকূলের আকাশ বাতাস। ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, নোয়াখালী ও চট্রগ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যায় এই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস।
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। বিকেলে বাতাস বাড়তে থাকে। রাতে আবহাওয়া অধিদপ্তর প্রচার করতে থাকে ১০ নং মহাবিপদ সংকেত। বঙ্গোপসাগরের সৃষ্ট নিম্নচাপটি হারিকেনের রূপ ধারণ করেছে ও যার প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় ২০-২৫ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাসের সম্ভাবনা রয়েছে। দুর্ভাগ্য উপকূলবাসীর কানে এই সতর্কবাণী পৌঁছেনি। তখন ছিল পবিত্র রমজান মাস। বৃহস্পতিবার রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। মধ্যরাতে হঠাৎ মানুষের আর্তচিৎকারে সবাই জেগে ওঠে। বাইরে প্রচণ্ড বেগে বাতাস বইছে। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই তীব্র গতিতে জোয়ারের পানি ঘর ডুবে আসবাবপত্র ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সবাই ছোটাছুটি করে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। ঘরবাড়ি, গাছপালা ভাঙার বিকট শব্দে প্রকৃতির ভয়ংকর গর্জনে মনে হয়েছে যেন কেয়ামত বুঝি শুরু হয়ে গেল। মানুষের বেঁচে থাকার করুণ আকূতি। কেউ চনের (নাড়া) চালায়, কেউ টিনের চালায়, কেউ গাছের মগডালে, কেউ হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই ধরে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা করেছে। এতেও শেষ রক্ষা হয়নি অনেকের। জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে ভেসে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে লাখ লাখ মানুষকে। শেষ রাতের দিকে মুহূর্তেই প্রকৃতি শান্ত হয়ে যায়। আস্তে আস্তে পানি নেমে যায়। চারদিকে ভেসে আসে মানুষের আর্তনাদ। সন্তান হারা মায়ের কান্না, মা হারা সন্তানের চিৎকার, ভাই হারা বোনের বুকফাটা ধ্বনিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। সর্বহারা মানুষগুলো একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে লজ্জা ঢাকার জন্য এক টুকরা ছেঁড়া কাপড় খুজতে থাকে।
১২ নভেম্বরের মহাপ্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভোলা জেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরায়। মনপুরার কোথাও বেড়িবাঁধ কিংবা সাইক্লোন শেল্টার তখনও গড়ে ওঠেনি। গাছপালা তেমন একটা লম্বা বা মোটা ছিল না। সাগর মোহনার ২০-২৫ ফুট উঁচু ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসে মনপুরার ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ ও গবাদি পশু স্রোতের টানে ভেসে গেছে উত্তাল সাগরে। প্রকৃতি শান্ত হলে দেখা যায়, গাছে গাছে ঝুলে আছে লাশ আর লাশ। যেখানে সেখানে লাশ আর লাশ। সাপ আর মানুষের একসাথে জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টার নিদর্শন দেখে মানুষ যেমন হয়েছে আতঙ্কিত তেমনই হয়েছে অভিভূত। মনপুরায় বেঁচে ছিল মাত্র ৮ হাজার স্বজন হারানো মানুষ।