সেই ২০০০ সাল থেকে স্বচ্ছতার সাথে পথচলা...

May 16, 2026 4:35 am

কোন ক্ষমতাবলে আইএসপিআর সব খোলার নির্দেশ দিল: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক

এবং সহিংসতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। মঙ্গলবার (৬ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহবাগ থেকে সহিংসতা বিরোধী মিছিল নিয়ে স্বাধীনতা ভাস্কর্যের পাদদেশে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানায় সংগঠনটি। একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলা হয়- ছাত্ররা অসহযোগের ডাক দিলেও তাদেরকে বাদ দিয়ে আইএসপিআর কোন ক্ষমতাবলে সকল কিছু খোলার ডাক দিল?

সোমবার শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা এবং দেশ থেকে পলায়নের পর সারা দেশে ছাত্র–জনতার বিজয় উদযাপনের ফাঁকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সনাতনসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়, বিভিন্ন সরকারি স্থাপনাসহ স্থানীয় পর্যায়ে নানা মানুষের বাড়িতে হামলা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। দেশজুড়ে বিভিন্ন থানায় এমনকি ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনেও হামলা হয়েছে। ঢাকা, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেক ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থাপনাও ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে বহু মানুষ নিহত হয়েছে, হয়েছে সম্পদহানি। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে সহিংসতার বিরুদ্ধে মিছিল ও সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে এর পরবর্তীতে একটি সংবিধান সভা গঠিত করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে এর আলোকে একটি অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন চার শিক্ষক। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘একটি চরম নিপীড়নমূলক ও ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে জুলাই মাসের প্রথম থেকে বাংলাদেশের আপামর শিক্ষার্থীবৃন্দ জন আন্দোলন শুরু করে। বৈষম্যের পরিবর্তে সাম্যের দাবি তোলায় তাদেরকে শিকার হতে হয় নির্মম জুলাই হত্যাকাণ্ডের। সরকারি হিসাবে ৩০০ জনের বেশি, এবং বেসরকারি হিসেবে এক হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী, শিশু থেকে বৃদ্ধ, পুরুষ ও নারী এবং সকল শ্রেণি-পেশার নাগরিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনগুলোর গুণ্ডাদের হাতে নৃশংস ও নারকীয় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ক্রমবর্ধমান নিপীড়ন-নির্যাতন-খুনের মুখে আর স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ও অনুসারীদের হিংস্র গোয়ার্তুমি আর প্রতিশোধপরায়ণতা, অব্যহত হামলার প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার্থী আন্দোলন একটি গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়। পরিণামে শিক্ষার্থী-নাগরিকদের অবিস্মরণীয় বিদ্রোহের মুখে গতকাল জুলাই-হত্যাকাণ্ডের মূল নির্দেশদাতা, ফ্যাসিস্ট এবং স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।’

এতে বলা হয়, ‘আমরা মনে করি–একটি নিপীড়নমূলক ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে এই মুক্তি অর্জন রাষ্ট্রকে মেরামত করে একটি গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী, অসাম্প্রদায়িক, সাম্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকারী রাষ্ট্রে রূপান্তরের কঠিন পথ আমাদের সামনে। মুক্তি এখনো অর্জিত হয়নি। ১৯ জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীকে মাঠে মোতায়েন করার পরও পরিস্থিতির ক্রমাবনতি হতে থাকে এবং গত রোববার (৪ আগস্ট) সারা দেশে সর্বোচ্চসংখ্যক (অফিশিয়াল হিসাবে ১০২ জনের বেশি) মানুষ নিহত হয়। অনির্দিষ্টকালের কারফিউ জারি এবং তিন দিনের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। যদিও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীবৃন্দ সরকারের এই ঘোষণা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে ৫ অগাস্ট ঢাকা মার্চ-এর ডাক দেয়।’

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে বিদেশে পালানোর পর সেনাপ্রধান জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা জানান। এরপর আমরা দেখতে পাই, সেনাপ্রধান বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি এবং বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদের সাথে মিটিংয়েও বসেন। এ বিষয়ে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলে, ‘এই সংকটময় মুহূর্তে আমরা বিস্মিত হয়ে ঢাকা শহরসহ সারা দেশে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুপস্থিতি, আর চেইন অব কমান্ডের পুরাপুরি অনুপস্থিতি লক্ষ্য করি। বিভিন্ন অঞ্চলে ও রাজধানীতে মোতায়েন সেনাসদস্যগণেরও নিস্ক্রিয়তা লক্ষ্যণীয়ভাবে আমাদের নজরে পড়ে।’

ক্ষমতার বদলে যে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে আলাদাভাবে কোনো পাঠ ছিল না কি–প্রশ্ন তুলে সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাওয়া হয়, ‘কোনো পরিণতি তাঁরা আগাম-আন্দাজ করতে পারেন নাই? এতগুলো গোয়েন্দাসংস্থা তাহলে খামোকা আছে? আর যদি কোনো রিডিং থেকে থাকে, তাহলে শেখ হাসিনার পরিণতির পর কীভাবে শৃঙ্খলা রক্ষা হবে, তার একটা আউটলেট তাঁরা তৈরি করেননি কেন? এ পরিস্থিতিতে আমাদের এও মনে হয়েছে যে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীকে ডাম্প করা হয়েছে। “ওয়ার-ক্যাজুয়ালটির”র মতো তাঁদেরকে ক্রুদ্ধ জনতার সামনে অরক্ষিত রাখা হয়েছে। জানমালের হেফজতের যে ওয়াদা সেনাপ্রধান করেছেন, তার জন্য আমরা সেনাবাহিনূকে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার আগেই পেশাগত কর্তব্য পালনের আহ্বান জানাই।’

শিক্ষকেরা বলেন, অথচ শাসন ও শাসক বদলের ক্রান্তিকালে ভয়াবহ নৈরাজ্য ও অরাজকতা সৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা সবসময়ই থাকে। প্রশাসনিক অস্পষ্টতা, শূন্যতা এবং সিদ্ধান্তহীতার সুযোগে দুষ্কৃতিকারীরা ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, লুটতরাজ চালানো শুরু করে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর, লুটপাট, থানা জ্বালিয়ে দেওয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা চত্বরের এবং বিখ্যাত ঐতিহ্য ময়মনসিংহের শশীলজসহ নির্বিচার ভাঙচুর, ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপরে হামলা, তাদের সম্পত্তি লুটপাট ও পোড়ানো শুরু হয়। একইসঙ্গে সন্ধ্যা থেকে খবর আসতে থাকে যে, কিছু স্থানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু ও তাদের বাসাবাড়িতে, ধর্মস্থানের ওপর হামলা লুটপাট অব্যহত রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের দপ্তরে ও মিডিয়া কর্মীদের ওপরে হামলা হয়েছে। এসব বহু হামলার খবর মিডিয়ায় পরিবেশিত হয় নাই এখনো। থানায়‑থানায় ক্ষিপ্ত জনতা পুলিশের ওপর হামলা করছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের ওপর হামলা করছে। নৃশংস সব মৃত্যুর খবর আমাদের কাছে নিয়মিত আসছে।’

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের উদ্বেগ জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘মধ্যরাত অবধি আমরা জানি যে সারাদেশে পুলিশের অনুপস্থিতি বজায় ছিলো, এবং সেনাবাহিনীর টহলও নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিলো। এছাড়াও, গতকাল দেশের বেশ কিছু স্থানে পুলিশ গুলি করে সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের ঘোরতর আশঙ্কা করছি আমরা। পুলিশের অনুপস্থিতিতে সেনাবাহিনী নাগরিকদের সুরক্ষায় এগিয়ে না এলে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের গণঅভ্যুত্থান নস্যাৎ হয়ে যেতে পারে। সাময়িক বিজয় গণতান্ত্রিক রূপান্তরের চূড়ান্ত পর্যায়ে না গিয়ে, একটি পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সুবিধাবাদী, মতলববাজ, অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শক্তির কাছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা আবার কুক্ষিগত হয়ে যেতে পারে। আমরা চাই অতি দ্রুত একটি সুস্থ সভ্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা দেশে চালু হবে। আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ দেখতে চাই যেখানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। যেকোনো ধরনের সন্ত্রাস একযোগে রুখে দিতেও আমরা বদ্ধপরিকর। পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখা হবে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম লক্ষ্য। তাই ছাত্র-জনতার এই অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানকে কেউ কালিমালিপ্ত করতে না পারে সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। উল্লাস-উচ্ছ্বাস যাতে কোনোরকম প্রতিহিংসার জন্ম না দেয়, সেদিকে দায়িত্বশীল নাগরিকদের সজাগ থাকতে হবে।’

যে বিষয়গুলোতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শিক্ষক নেটওয়ার্ক–
১। বাংলাদেশ বর্তমানে কার শাসনে কোন বিধি অনুসারে চলছে? সেনাপ্রধানের, নাকি প্রেসিডেন্টের, নাকি স্পীকারের তত্ত্বাবধানে মন্ত্রীসভার অধীনে? ছাত্ররা অসহযোগের ডাক দিয়েছে। তাহলে তাদেরকে বাদ দিয়ে আইএসপিআর কোন ক্ষমতাবলে সকল কিছু খোলার ডাক দিল?
২। গণভবন, বিভিন্ন পুলিশ থানাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা সুরক্ষায় পুলিশের উপস্থিতি নেই কেন? পুলিশের অবর্তমানে সেনাবাহিনী সুরক্ষা প্রদানে ব্যর্থ হলো কেন?
৩। কোন আইনের বলে এবং কোন কোন মানদণ্ডের আলোকে রাজনৈতিক নেতাদের বঙ্গভবনে সেনাবাহিনী প্রধানের সাথে দেখা করার জন্য মনোনীত বা নির্বাচিত করা হলো?
৪। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সুরক্ষা প্রদানে এবং চলমান সকল ধরনের সহিংসতা বন্ধে কোন ধরনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না কেন? এমন পদক্ষেপ এখন কে নেবে- রাষ্ট্রপতি নাকি সেনাবাহিনী?
৫। সেনাবাহিনীর কাজ হলো গণঅভ্যুত্থানকে নিরাপত্তা প্রদান করা এবং গণ অভ্যুত্থানকারীদের এখনকার কাজ হলো বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা। এটা নিয়ে আলাপ না করে সেনাবাহিনী কর্তৃক বা সেনাবাহিনী সমর্থিত সরকার সংক্রান্ত আলাপ জনপরিসরে উঠছে কেন? কারা এই ধরনের আলাপ তুলছে?
৬। সর্বোপরি, গণঅভ্যুত্থান সফল করা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সাথে সমাজের বিভিন্ন শ্রমজীবী ও পেশাজীবী শ্রেণি, সিভিল প্রশাসন এবং মিলিটারি প্রশাসনের সমন্বিত আলাপ ও আলোচনা শুরু না করে বঙ্গভবনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আলাপ করার মাধ্যমে জনগণকে কী বার্তা দেওয়া হচ্ছে?

পরিশেষে এই গণআন্দোলনের জন্য যারা তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন সেসব শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা হয়, ‘অতি দ্রুত দেশের জনগণের সুরক্ষা এবং সহিংসতা বন্ধের জন্যও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই।’