-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
নির্বাচনি সংস্কারের সিদ্ধান্ত হলেই ভোটের রোডম্যাপ
বলেছেন, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর। নির্বাচনের ট্রেন যাত্রা শুরু করেছে। এটা আর থামবে না।
নির্বাচনি সংস্কারের সিদ্ধান্ত হয়ে গেলেই ভোটের রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে। আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এসব মতামত অনেকাংশে প্রতিফলিত হচ্ছে। তিনি বলেন, দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি ভবিষ্যতের বাংলাদেশ বিনির্মাণের কথাও ভাবতে হচ্ছে। চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় তাদের প্রতিটি মতামত সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে, ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যেই সংস্কার কমিশনগুলো তাদের সুপারিশমালা সরকারের কাছে পেশ করতে পারবে। তাদের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ক্রমাগতভাবে আলোচনায় বসব। সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতেই আমরা সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করব।
রোববার সন্ধ্যায় অন্তর্বর্তী সরকারের ১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ৩৪ মিনিটের এক ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। ভাষণের শুরুতেই একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহিদ এবং গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অভ্যুত্থানে নিহত সব শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, নির্বাচন কবে হবেÑএ প্রশ্ন সবার মনেই আছে। আমাদের মনেও সারাক্ষণ আছে। আপনারা লক্ষ করেছেন নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছি। কয়েক দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন গঠন হয়ে যাবে। তারপর নির্বাচন আয়োজন করার সমস্ত দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তাবে। নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা হাল নাগাদসহ আরও কিছু কাজ শুরু করে দিতে পারবে, যা একটি অবাধ নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে যাতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সে লক্ষ্যেও কাজ করছে সরকার। একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করে দিলেই নির্বাচন আয়োজনে আমাদের দায়িত্ব শেষ। রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংস্কার এ সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। যে ছয়টি সংস্কার কমিশন আমরা শুরুতে গঠন করেছিলাম তারা ইতিমধ্যে তাদের কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। কয়েকটি সংস্কার কমিশন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গঠন করেছে। প্রথম ছয়টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে একটি হলো নির্বাচন সংস্কার কমিশন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এ কমিশনের সুপারিশমালা অত্যন্ত জরুরি।
সরকারপ্রধান বলেন, নির্বাচন নিয়ে সব বক্তব্য বিনা দ্বিধায় বলতে থাকুন। আমার অনুরোধ সংস্কারের কথাটাও একই সঙ্গে বলুন। সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে যাবেন না। অন্যান্য ক্ষেত্রে সংস্কারের কথাও বলুন। সংস্কার হলো জাতির দীর্ঘমেয়াদি জীবনীশক্তি। সংস্কার জাতিকে বিশেষ করে আমাদের তরুণ-তরুণীদের নতুন পৃথিবী সৃষ্টির সুযোগ দেবে। জাতিকে বঞ্চিত করবেন না। নির্বাচন আয়োজনে যে সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালায় রাজনৈতিক দলগুলো এবং দেশের সব মানুষের মতামত অপরিহার্য সেটি সংবিধান সংস্কার কমিশন। এ সুপারিশমালার কোন অংশ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে তার ভিত্তিতে নির্বাচনি আইন সংশোধন করতে হবে। সমান্তরালভাবে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া চলতে থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকার সৃষ্টি হয়েছে রাজনীতিকে নীতির কাঠামোয় আনার জন্য এবং রাজনীতির জন্য নতুন পরিবেশ সৃষ্টির নিবিড় আকাক্সক্ষা থেকে। এই আকাক্সক্ষা পূরণ করা থেকে জাতিকে বঞ্চিত করবেন না। আমরা দুদিন পরে চলে যাব।
তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচার পুলিশকে দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করেছে। বাধ্য হয়ে তাদের অনেকেই গণহত্যায় অংশ নিয়েছেন। খুবই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে তারা জনরোষের শিকার হয়েছেন। এতে তাদের মনোবল অনেক কমে যায়। আমরা পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে এনে তাদের আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকেও কিছু নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতিতে সহায়তা করেছে। ধৈর্যের পরিচয় দেওয়ায় জনগণকে ধন্যবাদ জানান সরকারপ্রধান। একই সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের শান্ত রাখায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, তারা তাদের কর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রতিশোধ স্পৃহায় লিপ্ত হয়ে কেউ যাতে হানাহানিতে জড়িয়ে না পড়ে সেই আহ্বান জানিয়েছেন। ফ্যাসিবাদী শক্তি ভয় দেখিয়েছিল তারা ক্ষমতা ছাড়লে দেশে লাখ লাখ লোক মারা পড়বে। টানা সাত দিন পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকার পরও ব্যাপক আকারে সহিংসতা এড়ানো গেছে। আমরা সরকারের প্রথম ১০০ দিন অতিক্রম করলাম। কঠিন এক পরিস্থিতিতে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়েছে। ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের পর ফ্যাসিস্ট সরকারপ্রধান পালিয়ে গেলে দেশ সরকার-শূন্য হয় সাময়িকভাবে। পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে উদ্বেগজনক এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, স্বৈরশাসনে বিপর্যস্ত দেশকে সবাইকে মিলে পুনর্গঠন করতে হচ্ছে। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর এমন একটি দেশ হাতে পেয়েছি যার সর্বত্র ছিল বিশৃঙ্খলা। স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিপ্লব চলাকালে প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-শ্রমিক জনতার শহিদি মৃত্যু হয়। সরকার প্রতিটি মৃত্যুর তথ্য অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে জোগাড় করছে। এ বিপ্লবে আহত হয়েছে ১৯ হাজার ৯৩১ জন। আহতদের ১৩টি হাসপাতালসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিদিনই তালিকায় নতুন শহিদের তথ্য যোগ হচ্ছে। প্রতিটি হত্যার বিচার আমরা করবই। পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনাকেও আমরা ভারত থেকে ফেরত চাইব। কেবল জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডই নয়, গত ১৫ বছরে সব অপকর্মের বিচার করব। অসংখ্য মানুষ গুম ও খুন হয়েছে। আমরা গুমের তদন্তে একটি কমিশন গঠন করেছি। কমিশনপ্রধান জানিয়েছেন, অক্টোবর পর্যন্ত তারা ১ হাজার ৬০০ গুমের তথ্য পেয়েছেন। তাদের ধারণা, এ সংখ্যা ৩ হাজার ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, গুম কমিশনের সদস্যদের কাছে ভুক্তভোগীদের যে বিবরণ পেয়েছি তা অত্যন্ত মর্মান্তিক। এসবের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবই। অভিযুক্ত যতই শক্তিশালী হোক, যে বাহিনীরই হোক তাকে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেবল দেশে নয়, গুম, খুন ও জুলাই-আগস্ট গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের আমরা আন্তর্জাতিক আদালতেও বিচারের উদ্যোগ নিয়েছি। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের প্রধান কৌশলী করিম খানের সঙ্গে এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে কথা হয়েছে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কোনো সদস্য কিংবা অন্য কেউ যাতে হত্যা, গুমসহ এ ধরনের কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে না পারে এ জন্য আমরা গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেছি। আপনারা দেখেছেন, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছেন। জাতিসংঘ জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই তারা তাদের রিপোর্ট হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানে সব শহিদের পরিবারকে পুনর্বাসন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, একজনও বাদ যাবে না। সব আহত শিক্ষার্থী-শ্রমিক-জনতার চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় সরকার বহন করবে। আহতদের দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা এবং শহিদদের পরিবারের দেখাশোনার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিটি শহিদ পরিবারকে ৩০ লাখ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। যারা বুলেটের আঘাতে তাদের দৃষ্টি শক্তি হারিয়েছেন তাদের চিকিৎসার জন্য নেপাল থেকে কর্নিয়া আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শহিদদের স্মৃতি ধরে রাখতে গঠিত ‘জুলাই শহিদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ বেশ পাকাপোক্তভাবে কাজ শুরু করেছে। এ ফাউন্ডেশনে সরকার ১০০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। এ ছাড়াও শহিদ পরিবারের পুনর্বাসন ও আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বরাদ্দ প্রস্তাব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, চলতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছয়টি বন্যা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীসহ সবার সহযোগিতায় বন্যা মোকাবিলা করেছি। বন্যা মোকাবিলা ও বন্যাপরবর্তী পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান এবং স্থানীয় অনুদানের মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। বন্যায় ফসলহানি হয়েছে। বন্যা পরবর্তী শাক-সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে আপনাদের কষ্ট হয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। বাজারে ডিমের সরবরাহ বাড়ানোয় সাড়ে ৯ কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দিয়েছি। এজন্য শুল্ক ছাড়ও দেওয়া হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্পটে সরকারি কৃষিপণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। টিসিবির মাধ্যমে ১ কোটি নিম্ন আয়ের ফ্যামিলি কার্ডের মধ্যে ৫৭ লাখকে স্মার্টকার্ডে রূপান্তরিত করা হয়েছে। চালের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। আসন্ন রমজানে নিত্যপণ্য সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে যাচ্ছে সরকার। মূল্যস্ফীতি রোধে উচ্চ সুদের হার নির্ধারণসহ একাধিক নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শস্য আমদানিতে এলসি সীমা অপসারণ এবং সরবরাহ চেইন সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। সামান্য হলেও জ্বালানি তেলের মূল্য কমানো হয়েছে। শিল্প কারখানায় গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গণ-শুনানি ছাড়া নির্বাহী আদেশে বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম না বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধের চেষ্টা করা হচ্ছে। নেপাল থেকে পানিবিদ্যুৎ আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে ।
তিনি বলেন, দেশে সংগঠিত অন্যান্য অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় সহস্রাধিক প্রসিকিউটর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টে ইতিমধ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ২৩ জন নতুন বিচারক। বিচার বিভাগকে ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য সম্ভব সব ধরনের চেষ্টাই করা হচ্ছে। বিচারপতিদের নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহাল করা হয়েছে। শুধু বিচার বিভাগই নয়, সর্বগ্রাসী দুর্নীতির হাত থেকে দেশের সব খাতকেই রক্ষা করতে সচেষ্ট রয়েছি। দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দুর্নীতি ও অর্থ পাচারে অভিযুক্ত প্রভাবশালী দেড়শ ব্যক্তির তালিকা তৈরি এবং ৭৯ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। ১৫ শতাংশ হারে আয়কর পরিশোধ করে অপ্রদর্শিত পরিসম্পদ অর্থাৎ কালো টাকা সাদা করার বিধান বাতিল করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি কার্যক্রমকে গতিশীল করতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পাবলিক সার্ভিস কমিশন পুনর্গঠন করা হয়েছে। কুখ্যাত সাইবার সিকিউরিটি আইন বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ আইনের অধীনে হওয়া সেসব মামলা মানুষের মত প্রকাশের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের দাবি মেনে ইতিমধ্যে সরকারি চাকরির বয়সসীমা ৩২-এ উন্নীত করা হয়েছে। আমরা জানি আমাদের কাছে আপনাদের আরও অনেক দাবি-দাওয়া আছে। প্রতিটি দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল। কিন্তু সে জন্য সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করলে সবারই অসুবিধা হয়। আমাদের বৃহৎ রফতানি পণ্য গার্মেন্টস শিল্পে গত কয়েক দিন ব্যাপক অস্থিরতা বিরাজ করেছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী বেশ কিছু গার্মেন্টস মালিক পালিয়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অন্য অনেক কারখানায়ও শ্রমিকরা ন্যায্য বেতনসহ অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। শ্রমিকরা তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার প্রতিবাদ জানাতে এবং অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে রাস্তায় নেমে আসে। বড় ধরনের কোনো সহিংসতা ছাড়াই আমরা শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন করতে পেরেছি। তারা আবার উৎপাদনে ফিরেছে। এতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশের রফতানিমুখী এই শিল্পও। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অক্টোবর মাসে আমাদের রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশের অর্থনীতি ছিল বিপর্যস্ত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে। গত তিন মাসে রিজার্ভে কোনোরকম হাত না দিয়েই আমরা প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ শোধ করতে পেরেছি। জ্বালানি তেল আমদানিতে পুঞ্জীভূত বকেয়ার পরিমাণ ৪৭৮ মিলিয়ন ডলার থেকে কমিয়ে ১৬০ মিলিয়ন ডলারে আনতে পেরেছি। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা ইতিমধ্যে ঋণ ও অনুদান হিসেবে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা আমাদের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করতে সক্ষম হবে। এর মধ্যেও জুলাইয়ের নেতিবাচক অবস্থা থেকে অক্টোবর নাগাদ রাজস্ব আদায়ে পৌনে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এর ফলে স্বৈরাচার পতনের পরবর্তী তিন মাসে পৌনে ৯ শতাংশ রাজস্ব বৃদ্ধির পরও লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২৩ শতাংশের বেশি ঘাটতি থেকে যায়। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, ইউএনডিপির প্রধানদের সঙ্গেও আমার দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে। তারাও বাংলাদেশকে নতুনভাবে সাহায্য করতে তাদের আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে যাবতীয় সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন।
সরকারপ্রধান বলেন, ১০০ দিন আগে আর্থিক দিক থেকে আমরা যে লন্ডভন্ড অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করেছিলাম, সেটি এখন অতীত ইতিহাস। এই ১০০ দিনে অর্থনীতি সবল অবস্থানে চলে এসেছে। বন্ধু রাষ্ট্রগুলো শুধু যে আমাদের বড় বড় অঙ্গের সাহায্য নিয়ে আসছে। এই সাহায্য আসা শুরু করলে আমাদের অর্থনীতি অত্যন্ত মজবুত এবং আকর্ষণীয় অর্থনীতিতে পরিণত হবে। বিশ্বের রাষ্ট্রপুঞ্জের মজলিসে আমরা এখন সম্মানিত এবং প্রশংসিত দেশের অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি। এর কারণে পরাজিত শক্তি নানা কৌশল করেও তাদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে না। পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্র থেকে নিজেকে মুক্ত রাখুন, দেশকে মুক্ত রাখুন। এমন কিছু করবেন না যা তাদের উৎসাহিত করতে সাহায্য করে। বিপক্ষ শক্তি যত শক্তিশালীই হোক, নাশকতার যত রকমই উদ্ভট পরিকল্পনাই করুক, সবকিছু নস্যাৎ করার জন্য প্রস্তুত থাকুন।
তিনি বলেন, পতিত সরকার ও তার দোসররা প্রতি বছর দেশ থেকে ১২-১৫ বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সম্প্রতি এ তথ্য দিয়েছে। পাচার হয়ে যাওয়া এই অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য সম্ভব সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। বাংলাদেশের এই সংকটময় সময়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দও প্রায় সবাই সহযেগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমি যখন সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিই, সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডা, ইতালি, হল্যান্ড, জাতিসংঘ মহাসচিবসহ বিশ্বের অনেক দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে আমার বৈঠক করার সুযোগ হয়। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। নেপাল, মালদ্বীপ, পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী বেশ কয়েকটি দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গেও আমার বৈঠক হয়েছে। দিল্লি থেকে একসঙ্গে ২০ জন রাষ্ট্রদূতসহ মোট ২৭ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সমবেতভাবে আমার সঙ্গে বৈঠক করার জন্য আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ঢাকায় আসছেন। ইতিমধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করেছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ব্রাজিল, তুরস্ক, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, লিবিয়াসহ অনেক দেশের রাষ্ট্রদূত। দ্বিপক্ষীয় নানা সহযোগিতাসহ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির আশ্বাস তারা দিয়েছেন।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, আমরা প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানাচ্ছি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও তরুণদের কর্মসংস্থানের মূলে রয়েছে বেসরকারি খাত। আমাদের বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান দুই শতাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেছেন। নীতির ধারাবাহিকতার অভাব, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে মতবিনিময়ের অভাব, সরকারি অফিসের জটিল প্রক্রিয়া এবং সর্বোপরি দুর্নীতি, বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের সমস্যায় ফেলেছে। আমরা প্রবাসীদের কল্যাণে কাজ করছি।
আমার অনুরোধে সংযুক্ত আরব আমিরাত সাজাপ্রাপ্ত ৫৭ জনসহ অন্যান্য বাংলাদেশিকে মুক্তি দিয়েছে। এসব বাংলাদেশি কারাবাসের ঝুঁকি নিয়ে ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে প্রতিবাদ করেছিল। কয়েক দিন আগে বাকুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন বাংলাদেশের জন্য যেকোনো সাহায্য লাগলে আমি যেন তাকে জানাই। আমরা ইতিমধ্যে আসিয়ানের সদস্য পদের জন্য আবেদন করেছি। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম আমাদের আবেদন সক্রিয়ভাবে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। একই ধরনের আশ্বাস আমরা পেয়েছি ইন্দোনেশিয়া থেকেও। সৌদি আরবসহ বিশ্বের আরও অনেক দেশ আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। নতুন হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। তাতে হজের ব্যয় ১ লাখ টাকারও বেশি কমিয়ে আনা হয়েছে। এ বছর সরকারি খরচে কাউকে হজে না পাঠানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছি আমরা।
সরকারপ্রধান আরও বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাসের মাথায় দেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়েছে প্রায় ৩২ হাজার পূজামণ্ডপে। দুর্গাপূজাকে ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেওয়ায় নির্বিঘ্নে তাদের উৎসব পালন করেছে। আমরা দায়িত্বে আসার পর যে অল্প কয়েকটি ক্ষেত্রে তারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন আমরা তার প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করছি। শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ই নয়, দেশের কোনো মানুষই যাতে কোনোরকম সহিংসতার শিকার না হয় সে জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি।
তিনি বলেন, আমরা নতুন বাংলাদেশকে একটি পরিবেশবান্ধব এবং জীববৈচিত্র্যময় দেশ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি। সমগ্র সচিবালয়ে প্লাস্টিকের পানির বোতল ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছি। ইতিমধ্যে সুপারশপগুলোতে পলিথিনের শপিংব্যাগ ব্যবহার বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত কয়েক দশকে যে পরিমাণ নদীদূষণ হয়েছে, আমরা তা বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছি। জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জীবনযাত্রার জন্য হুমকি হয়ে আসছে। গত এক বছরে বাংলাদেশ প্রায় ১৫টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে। মানুষের সৃষ্ট নানাবিধ দুর্যোগের পাশাপাশি এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিপক্ষেও আমাদের লড়তে হচ্ছে। আজারবাইজানে জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছি। জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকার অনেক সরকারপ্রধান জলবায়ুর প্রতিকূল প্রভাব মোকাবিলাসহ গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছেন সবাই।
সময়ের আলো/১৭ নভেম্বর, ২০২৪