-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
বাঁশের তৈরি সাইকেলের গল্প
মোহাম্মদ ইমন আছেন যুক্তরাজ্যে। সেখানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। বাঁশকেলের আইডিয়া দিয়ে বাংলাদেশে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন ওরা দুই বন্ধু; সজীব ও ইমন। বাঁশকেল হলো বাঁশের তৈরি সাইকেল। ইমন যুক্তরাজ্যে এখন একটি ই-বাইকের দোকান দিয়েছেন। পরিবেশবান্ধব এই সাইকেলের অত্যন্ত ভালো বাজার ইউরোপ। তাই দুই বন্ধুর আশা, নিজেদের আরেকটু গুছিয়ে নিয়ে তারা আবারও বাঁশকেল বাজারজাত করবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করে সজীব দেশে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যুক্ত আছেন। ইমনের স্বপ্ন ছিল, বড় লরির ড্রাইভার হবেন, সে দেশে সাইকেল নিয়ে কাজের পাশাপাশি তিনি তাই লরিও চালান। ইমনের সঙ্গে কথা বলেছেন জাকির উসমান
কীভাবে ও কী ভাবনা থেকে শুরু হয়েছিল বাঁশকেলের যাত্রা?
২০১৩ সালে বিজিএমইএতে একটা ইনোভেশন এক্সপো হয়। তখন আমার বন্ধু সজীব কুমার বর্মণ প্রথম এই আইডিয়াটা ইনিশিয়েট করে। তারপর সে একটা স্লাইড রেডি করে ওখানে প্রপোজাল দেয়। সিলেকশন বোর্ড ব্যাপারটা পছন্দ করে। কিন্তু তারা আসলে এটার ফিজিক্যাল ইপ্লিমেন্টেশন দেখতে চাচ্ছিলেন। আমার বন্ধু সমস্যায় পড়ে যায় যে আসলে এটা কে করবে। তখন সে আমার কাছে আসে। এবং আমরা দুজন মিলে এটা শুরু করি। এভাবেই ২০১৩ সালে শুরু হয় বাঁশকেলের যাত্রা।
একটা শহরকে কীভাবে বদলে দিতে পারে সাইকেল, কী মনে করেন?
একটা শহরের পরিবর্তনের জন্য সাইকেলের প্রভাব ও প্রয়োজন বিরাট। দেশের বাইরে থাকি। গাড়ি থাকা সত্ত্বেও এখানকার মানুষ নিয়মিত সাইকেল চালায়। তারা পরিবেশ নিয়ে অনেক সচেতন। স্বাস্থ্য নিয়েও সচেতন। তারা কাছাকাছি দূরত্বে সাইকেল ব্যবহার করে। এখানে নানা ধরনের ফেস্টিভাল, ফেস্ট, কনটেস্ট এসব হয়। ফান্ড রাইজিং হয়। অনেক কনসেপ্ট নিয়ে কাজ করা হয় এখানে। যেগুলো বাংলাদেশে কম। এক সময় বিডি সাইক্লিস্ট শুরু করেছিল, কিন্তু এখন বিডি সাইক্লিস্টের তেমন এক্টিভিটি দেখা যায় না। বাংলাদেশে যারা কোনো উদ্যোগ শুরু করে, তারা একটা টার্গেট নিয়ে শুরু করে। টার্গেট পূরণ হয়ে গেলে তারা অন্যদিকে চলে যায়। মাঝখান থেকে যারা এটার পিছনে সময় ও শ্রম দেয়, তারা পড়ে যায় বিপদে। ঢাকা শহরে যারা কম দূরত্বে কাজে যায়, তারা অবশ্যই মেন্যুয়াল ব্যবহার না করলেও অন্তত ই-সাইকেল ব্যবহার করতে পারে। এতে কার্বন নিঃসরণ কমবে। পরিবেশের উপরও খারাপ প্রভাব কমবে।
আমাদের বাঁশকেলের কনসেপ্টটা ইকো-ফ্রেন্ডলি। বাজারের সাইকেলে আইরন আছে। মেটাল আছে; যেটাকে আমরা বলি এলুমিনিয়ামের সাইকেল। এই এলুমিনিয়াম তৈরিতে কিন্তু অনেক কার্বণ নির্গত হয়। কিন্তু বাঁশকেলের ব্যাম্বো স্টিক বা বাঁশ এগুলো প্রকৃতি থেকে নেওয়া। যেমন, বাঁশ কিন্তু একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকে, তারপর মারা যায়। এটা যখন একেবারে ম্যাচিউর হয়, তখন এটা কেটে ফেলা হয়। কেটে এটাকে প্রসেস করে নিয়ে আসা হয়। তো এটার উৎপাদন থেকে শুরু করে ব্যবহার পর্যন্ত এটা পুরোটাই পরিবেশবান্ধব। এই কনসেপ্ট থেকে আমরা বাঁশকেল শুরু করেছিলাম।
আরেকটা জিনিস এড করতে চাই আমার মতে, ঢাকা শহরে যাদের দৈনন্দিন যাতায়াত করতে হয়, তারা যদি সাইকেল ব্যবহার করত। এটা অর্থনীতির জন্য অনেক সাশ্রয়ের কারণ হত। তাদের স্বাস্থ্যও ভালো থাকত। আমাদের ঢাকা শহরে এই যে এত ধূলাবালি, এই সমস্যাগুলো অনেক কমে যেত। এসব ক্ষেত্রে জাপানসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে সাইকেল ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকেলের একটা সার্ভিস চালু হয়েছিল, অল্প দূরত্বে স্টুডেন্টরা যেন রিকশা ব্যবহার না করে একটা নির্দিষ্ট পয়েন্ট থেকে সাইকেল নিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে কোথাও যেতে পারে। ক্লাস করতে যেতে পারে। এটা পরে সম্ভবত ফান্ডিংয়ের কারণে অফ হয়ে গেছে। কিন্তু এখানে ইউকেতে প্রত্যেকটা বড় শহরে এটা চালু আছে। এবং প্রতিনিয়ত এই সিস্টেমটা আপডেটও হচ্ছে। কেউ কেউ সাইকেলকে ই-সাইকেলে কনভার্ট করে নিচ্ছে।
বাঁশকেল কি গতানুতিক সাইকেল থেকে আলাদা?
বাঁশকেল সবদিক থেকেই আলাদা। উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ব্যবহার পর্যন্ত এটার সবগুলো দিক ইকো ফ্রেন্ডলি। মানে একটা প্রোডাক্ট যখন তৈরি হয়, আপনি যদি কার্বন নিঃসরণের কথা চিন্তা করেন, একটা মোবাইল ফোন উৎপাদন করতে গেলেও কিন্তু প্রকৃতির ওপর তার একটা প্রভাব পড়ে। আমাদের যে প্রোডাক্টটা তৈরি করা হয়েছিল, উৎপাদন থেকেই এটা পুরোপুরি কার্বন ফ্রেন্ডলি। সুতরাং এটা বাঁশকেলের একটা মার্কেটিং পয়েন্ট। দ্বিতীয় দিক হলো, এটার যে লুক, এটা ট্র্যাডিশনাল সাইকেল থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। আরেকটি ব্যাপার হলো আমরা আগের দিনে বাসাবাড়িতে যেরকম জুতা পলিশ করতাম, জুতা সম্পূর্ণ নতুন হয়ে উঠত, এটা ঠিক এরকম। একটু পলিশ বা ওয়াশ করলেই এটা নতুনের মতো চকচক করে। সাধারণ সাইকেলের ক্ষেত্রে এটা দেখা যায় না। এটা হচ্ছে বাঁশকেলের ইউনিকনেস।
কেন বন্ধ হয়ে গেল?
এর অনেকগুলো কারণ আছে। ২০১৩ সালে আমরা যখন শুরু করি, তখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। ওই সময় আমরা আমাদের জমানো টাকা, টিউশনির টাকা ইত্যাদি মিলিয়ে প্রজেক্টটা দাঁড় করিয়েছিলাম। বাঁশকেলের পেছনে আমরা প্রায় ৩ বছর লেদ মেশিনের কাজ থেকে শুরু করে একটা সাইকেল কীভাবে ডিজাইন করতে হয় সবকিছু সজীব সাইকেলের ডিজাইনগুলো দেখত, আমি র মেটারিয়ালস কোথা থেকে কালেক্ট করতে হবে, লেদ মেশিনের কাজটা কীভাবে করতে হয়, ওয়েল্ডিং কীভাবে করতে হয়, যদিও ওয়েল্ডিং এখানে লাগে না, কিন্তু আমাদের শিখতে হয়েছে। এগুলোর পেছনে অনেক সময় দিয়েছি। একটা পর্যায়ে যখন আমরা প্রোডাক্টটা দাঁড় করিয়েছি, মোটামুটি সবার রেসপন্স পেয়েছি, তখন একটা প্রবলেম দাঁড়িয়েছে আমাদের ফান্ডিংয়ের। দুজনই তখন স্টুডেন্ট। বাসা থেকে তো এ ধরনের কাজের জন্য টাকা দেয় না। আমরা যখন ইনভেস্টরদের কাছে গেলাম, তাদের প্রপোজালগুলো আমাদের ভালো লাগল না। শুধুমাত্র সাইকেল বিক্রি করে তো একটা কোম্পানি বা স্টার্টআপ রান করা যায় না। তো সাথে আমাদের বাইপ্রোডাক্ট অনেক কিছু নিয়ে আইডিয়া ছিল। বেশিরভাগ ইনভেস্টরই আসলে প্রস্তাব দিলো, আমার আর সজীবের পনেরো পনেরো ত্রিশ পার্সেন্ট শেয়ার আর তাদের সত্তর পার্সেন্ট। এসব ক্ষেত্রে হিস্টোরি ঘাঁটলে আমরা আসলে কী দেখি যখন একটা কোম্পানি ভালো একটা দিকে চলে যায়, তখন যার শেয়ার পাওয়ারটা বেশি থাকে, বাকি উদ্যোক্তা বা ফাউন্ডার যারা থাকে, তাদেরকে কিক আউট করে দেয়। তো এসব দিক চিন্তা করে তখন আমরা আর আগাতে পারিনি। এটা আমাদের খুবই শখের প্রজেক্ট। এর পেছনে অনেক সময় ব্যয় করেছি। অনেক পরিশ্রম করেছি। ওই সময় আমরা দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিই এটা যদি আমরা কখনো করতে পারি, তাহলে আমরা নিজেদের টাকাই করব। আর না হলে এটা এভাবেই থাকবে। এরকম না যে আমরা একেবারে আশা ছেড়ে দিয়েছি। এটা ছাড়িনি আমরা।
কেন ছড়িয়ে দেওয়া দরকার এই সাইকেল?
যদি আমরা সত্যিই এটার মার্কেট সাইজ চিন্তা করি, সারা বিশ্বেই এর মার্কেট অনেক বড়। কিন্তু আপনি যদি আমাদের প্রোডাক্টের কথা বলেন, বাঁশকেল, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমার আর সজীবের রিসার্চ অনুযায়ী, এই দেশে এর মার্কেট সাইজ খুবই ছোট। কারণ হচ্ছে আমাদের দেশের মানুষের সচেতনতা। তাদের জ্ঞানবোধ এবং তাদের একটা প্রোডাক্টের ক্ষেত্রে এক ধরনের সাইকোলজি কাজ করে, কয়েকভাবে তারা সেটা নিয়ে ভাবে। এটা আসলে আর্থিক স্বচ্ছলতারও একটা বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ প্রথমেই ভাবে, বাঁশের সাইকেল। বাঁশ তো আমাদের দেশের এভেইলেবল এবং খুব পরিচিত একটা জিনিস। তো তারা প্রথমেই ভাবে, এটা ভেঙে যাবে। আসলে কিন্তু তা না। এটা যখন আমরা বানাই, অনেকভাবে এটার কার্যকারিতা নিয়ে টেস্ট করে দেখেছি। এটা এত সহজে ভাঙে না। যারা সৌখিন সাইক্লিস্ট বা বাইকার এটা মূলত তাদের জন্য। আর ইউরোপে বাঁশের তৈরি সাইকেলের মার্কেট খুবই ভালো। এখানে খুবই ভালো দামে সেল করা যায়। একটা প্রোডাক্ট আসলে তার কাছেই সেল করা যায়, যে এটার ভ্যালু বোঝে। বাঁশকেলের জন্য বাংলাদেশের মার্কেট রেডি না। এর টার্গেট মার্কেট হচ্ছে ইউরোপ।
এখনো কি সম্ভব আবার ঘুরে দাঁড়ানোর, সে ক্ষেত্রে কী রকম এবং কাদের সহযোগিতা হলে আবার আলোর মুখ দেখতে পারে ‘বাঁশকেল’?
এটা আমরা এখনো ছেড়ে দিইনি একেবারে। তবে বাংলাদেশে এটা আর শুরু করা সম্ভব না। তবে আমাদের প্রোডাক্টের নাম বাঁশকেলই থাকবে। আবারও বলছি, এটা কোনোভাবেই বন্ধ হয়নি। আমরা আসলে থামতে চাই না। থামবও না। এখনো স্বপ্ন দেখি, একদিন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এই পরিবেশবান্ধব বাহনটি বিশ্ববাজারে জায়গা করে নেবে। আমরা আবার শুরু করব। সময় বলে দেবে সেই দিনক্ষণ।
/এমএইচআর
জাকির উসমান
সময়ের আলো/৩ জুন, ২০২৫