সেই ২০০০ সাল থেকে স্বচ্ছতার সাথে পথচলা...

May 17, 2026 1:26 pm

কঙ্গোতে ইবোলার থাবা, মৃত্যু ৮০

শনিবার (১৬ মে) প্রাদুর্ভাব ঘটা প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগটির সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের সন্ধান ও স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা জোরদার করতে তীব্র তৎপরতা শুরু করেছেন। মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে নতুন করে প্রাদুর্ভাব ঘটা প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৮০ জনে দাঁড়িয়েছে।

এর আগে গত শুক্রবার দেশটির কর্তৃপক্ষ ইবোলার এই নতুন প্রাদুর্ভাবের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে, যেখানে প্রাথমিক প্রতিবেদনে ৬৫ জনের মৃত্যু এবং ২৪৬ জন সন্দেহভাজন রোগীর কথা জানানো হয়েছিল। ইতুরির প্রাদেশিক রাজধানী বুনিয়া শহরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দিনরাত অনবরত একের পর এক মরদেহ দাফন করার কারণে পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

কঙ্গোর জাতীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্যামুয়েল-রজার কাম্বা শুক্রবার গভীর রাতে এক বিবৃতিতে জানান, ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত আটটি নিশ্চিত কেস বা আক্রান্তের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার মধ্যে চারজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন। ল্যাব টেস্টের ফলাফলে এই রোগীদের শরীরে ‘বুন্দিবুগিও ভাইরাস’ নামক ইবোলার একটি বিরল ভ্যারিয়েন্ট বা স্ট্রেন শনাক্ত হয়েছে, যা কঙ্গোর অতীতের প্রাদুর্ভাবগুলোতে খুব একটা দেখা যায়নি।

উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সালে কঙ্গোর মাটিতে প্রথম ইবোলা ভাইরাসের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে এটি ১৭তম প্রাদুর্ভাব। অত্যন্ত সংক্রামক এই ইবোলা ভাইরাস মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল পদার্থ যেমন বমি, রক্ত বা বীর্যের সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে সুস্থ মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি অত্যন্ত মারাত্মক ও দ্রুত প্রাণঘাতী রূপ নেয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নতুন প্রাদুর্ভাবের ‘ইনডেক্স কেস’ বা প্রথম সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বুনিয়া শহরের একটি হাসপাতালে মারা যাওয়া একজন নার্সকে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত ২৪ এপ্রিল ওই নার্সের মৃত্যু হয়েছিল, যা বর্তমান সময় থেকে প্রায় তিন সপ্তাহ আগের ঘটনা।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কাম্বা অবশ্য স্পষ্ট করে জানাননি যে ওই নার্সের মরদেহ থেকে রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে মৃত্যুর আগে ওই নার্সের শরীরে ইবোলার সমস্ত স্পষ্ট ও দৃশ্যমান উপসর্গ উপস্থিত ছিল। বর্তমানে এই প্রদেশের রাজধানী বুনিয়া ছাড়াও রুয়ামপারা এবং মংওয়ালু নামক তিনটি স্বাস্থ্য জোনে ইবোলার উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে, যার মধ্যে মংওয়ালু এলাকায় সংক্রমণের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি।

কঙ্গোর অতীত অভিজ্ঞতায় ইবোলা প্রাদুর্ভাব সফলভাবে মোকাবিলার নজির থাকলেও দুর্গম ও প্রত্যন্ত আক্রান্ত অঞ্চলগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী এবং বিশেষজ্ঞ দল পাঠাতে দেশটিকে সব সময়ই চরম লজিস্টিক বা পরিবহন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ভূখণ্ডের দিক থেকে আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম এই দেশের এক একটি প্রদেশ পারস্পরিক দূরত্বে অনেক দূরে অবস্থিত এবং দেশটির পূর্বাঞ্চল দীর্ঘ দিন ধরে সশস্ত্র সংঘাতে জর্জরিত।

ইবোলা কবলিত ইতুরি প্রদেশটি রাজধানী কিনশাসা থেকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং এলাকাটি বর্তমানে ইসলামিক স্টেট বা আইএস সমর্থিত উগ্রপন্থী মিলিশিয়াদের সহিংসতায় প্রায় অবরুদ্ধ। দেশটির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োমেডিকেল রিসার্চে মাত্র ১৩টি রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে ৮টিতে বুন্দিবুগিও স্ট্রেন পজিটিভ এসেছে এবং বাকি ৫টি নমুনা পর্যাপ্ত পরিমাণের অভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়নি।

আফ্রিকা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (আফ্রিকা সিডিসি) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, আক্রান্ত ইতুরি প্রদেশটি উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের আন্তর্জাতিক সীমান্তের খুব কাছে হওয়ায় এই মরণব্যাধি ভাইরাসটি দ্রুত আরও একাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতুরির প্রধান শহর বুনিয়ার কেন্দ্রস্থলে শুক্রবার পর্যন্ত সাধারণ ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনাকীর্ণ পাবলিক প্লেসগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক দেখা গেলেও স্থানীয়দের মনে গভীর উদ্বেগ কাজ করছে। বুনিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা জঁ মার্ক আসিমওয়ে জানান, গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একক দিনে তারা দুই, তিন বা তারও বেশি মানুষের মরদেহ দাফন করছেন। অনেক সাধারণ মানুষ এখনো বুঝতে পারছেন না এটি আসলে ঠিক কী ধরনের রোগ।

অন্যদিকে কঙ্গোর সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও ইতিমধ্যে একজন ইবোলা রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যাকে কঙ্গো থেকে ‘আমদানিকৃত’ কেস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালার একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়েছে।

সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

১৭ মে, ২০২৬

আরও - আন্তর্জাতিক সংবাদ