সেই ২০০০ সাল থেকে স্বচ্ছতার সাথে পথচলা...

May 16, 2026 1:58 pm

ফুলের গ্রামে সুখের ঘ্রাণ

প্রায় ৩০ হেক্টর জমি। সেখানকার লাল-কমলা-হলুদ-গোলাপি রঙের কোলাজে মন ভরে যায়। সেই রামধনু রং ঘিরেই এখানকার দুই শতাধিক পরিবারের বেঁচে থাকা।

উত্তরের জেলা গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলা শহর লাগোয়া ইদিলপুর ও ভাতগ্রাম ইউনিয়নের চকনদী, রাঘবেন্দপুর, লক্ষ্মীপুর, তাজনগর, আমবাগান ও কৃষ্ণপুর গ্রাম। এসব গ্রামের সব ফাঁকফোকর ঢেকে দেয় গোলাপ, গাঁদা, রজনিগন্ধা, গ্ল্যাডিওলাস, চন্দ্রমল্লিকা, কসমসের বাহারি রং। ফুলের টানেই ফুল চাষ করেন গ্রামগুলোর বাসিন্দারা। শীতকালে মৌসুমি ফুলে ঢেকে যায় চারপাশ। কিন্তু বছরের অন্য সময়েও যে যার মতো করে ফুল ফলান জমিতে। নার্সারি করেন কেউ কেউ। অর্থাৎ সেই ফুলকে ঘিরেই বেঁচে থাকার রসদ সংগ্রহের চেষ্টা এসব গ্রামের মানুষের।

এখানকার ফুল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব প্রান্তের চাহিদা পূরণ করে থাকে। এতে যেমন কৃষকের লাভ বেড়েছে তেমনি অন্যদিকে সরকারও লাভবান হচ্ছে। বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে চাষিদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়।
আর কয়েক দিন পর বসন্ত উৎসব। আছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ তিনটি দিবসের বাজার ধরতে প্রস্তুত ফুল চাষিরা। এরই মধ্যে চাষি, পাইকার, শ্রমিকদের পদচারণে মুখর হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলের ফুল বাগান ও বাজার। জেলায় যে ফুল বিক্রি হয় তার প্রায় বেশিরভাগই সরবরাহ করা হয় এখান থেকে। ভালো মানের ফুল বাজারজাত করতে এখন চাষিরা পরিচর্যাকাজে ব্যস্ত। দিবসগুলোতে প্রায় কোটি টাকার কেনাবচার আশা করছেন ফুলচাষিরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, গাইবান্ধায় কৃষিজমিতে ফুল চাষ করে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। গত পাঁচ বছরে জেলায় বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ বেড়েছে কয়েকগুণ। এখানকার মাটি ফুল চাষের জন্য বেশ উপযোগী। কৃষকরা আগে জমিতে ধান আবাদ করতেন। এর পাশাপাশি কয়েক বছর আগে জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার দুটি ইউনিয়নের বেশকিছু গ্রামে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল চাষ শুরু করেন কয়েকজন কৃষক। অল্প খরচে বেশি ফলন পেয়ে ফুল চাষ করে যথেষ্ট লাভবান হন তারা। তাদের ফুল চাষে সফলতা দেখে এখন অনেকেরই এ কাজে আগ্রহ বাড়ছে।

ফুলচাষিরা জানান, তারা অন্যান্য শস্য চাষ করে যা পান তার থেকে আট-দশগুণ বেশি লাভবান হচ্ছেন ফুলচাষ করে। এ কারণে অনেকেই বাপ-দাদার চাষবাদ পরিবর্তন করে ফুল চাষের প্রতি ঝুঁকেছেন। ফুলের গ্রামে এখন সুখের ঘ্রাণ। এসব গ্রামের মানুষ ফুল চাষ করে তাদের পুরো এলাকার চিত্র পাল্টে দিয়েছেন। গ্রামের ফুলচাষিরা সবাই এখন স্বাবলম্বী। ফুলের শোভায় তাদের মন জুড়োয়। ফুল চাষের মাধ্যমে চাষিরা সচ্ছল হওয়ার পাশাপাশি সৃষ্টি করেছেন অনেক লোকের কর্মসংস্থান। ফুলের গ্রামে সুখের ঘ্রাণ ছড়ালেও ফুলচাষিদের বাজার অবকাঠামো, সংরক্ষণ, পরিবহনের সুবিধা ও চাষাবাদ বাড়াতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি চাষিদের।

সরেজমিন দেখা যায়, ইদিলপুর ইউনিয়নের চকনদী ও রাঘবেন্দপুর গ্রামের মাঠজুড়ে কেবল ফুল আর ফুল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই চোখ জুড়িয়ে আসতে চায়। ফুলের সুবাস যেন মন ভরিয়ে দেয়। এ গ্রামগুলোর অধিকাংশ জমি ও বাড়ির আঙিনায় গাঁদা, গোলাপ, ডালিয়াসহ হরেক রকমের ফুলের বাগান। এখানে কেউ পা রাখলেই বিস্মিত হয়ে ওঠেন। গ্রামগুলোকে ঘিরে শুধু বাগান আর বাগান। ফুল চাষে পুরুষদের পাশাপাশি নারী ও স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও জড়িত রয়েছে। তারা প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে ফুল বাগান পরিচর্যার উদ্দেশ্যে যায়। নানা আলাপচারিতার ফাঁকে ফাঁকে ফুল বাগানের পরিচর্যার ব্যস্ত সময় পার করেন ওই এলাকার নারীরা। এলাকাজুড়ে জারবেরা, চন্দ্রমল্লিকা, গ্লাডিওলাস, গোলাপ, গাঁদা, ডালিয়া ও রজনিগন্ধা ফুলের গুচ্ছ গুচ্ছ বাগান আর ফলদ-বনজ গাছের নার্সারি। গ্রামগুলোতে ফুলের বাগান করে দুই শতাধিক মানুষের পরিবারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। তাই গ্রামগুলো এখন ফুলের গ্রাম নামে পরিচিতি লাভ করেছে।
একটা সময় এসব গ্রামে নুন আনতে পান্তা ফুরোনো সংসার ছিল বেশিরভাগেরই। এখন ফুল চাষ করে উপার্জনের টাকাতেই চলে সংসার। উর্বর জমিতে অন্য কিছু চাষ করেন না বাসিন্দারা। ফুলের চাষাবাদ করে গ্রামগুলোর লোকজন তাদের ভাগ্যের চাকার পরিবর্তন করেছেন। বদলে যেতে শুরু করেছে এসব গ্রামের দৃশ্যপট। ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা শান্ত পরিবেশের গ্রামগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার লোক জড়িয়ে আছেন ফুলের বাগানের সঙ্গে। তারা ফুল উৎপাদন, ফুলের মালা তৈরি ও ফুল বিক্রিতে সরাসরি জড়িত আছেন। প্রতি মৌসুমে লাখ লাখ টাকার ফুল স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানের ফুলের আড়তে যায়। অথচ ফুল চাষের জন্য মেলে না কোনো সরকারি সাহায্য।

চকনদী গ্রামের বাসিন্দা ফুলচাষি আনিসুর রহমান বলেন, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফুল চাষ হয় এই এলাকায়। উত্তরবঙ্গের সব জেলা তো বটেই, ঢাকা ও চট্টগ্রামেও যায় এ অঞ্চলের ফুল। কিন্তু এখানকার ফুলচাষিদের কোনো উন্নয়ন হয় না। কারণ এ নিয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনাই নেই।

একই এলাকার আরেক যুবক সবুজ মিয়া বলেন, নিজেদের চেষ্টায় ভালোবেসে ফুল চাষ করি আমরা। একটু সরকারি সাহায্য পেলে ‘উত্তরাঞ্চলের সেরা ফুল’ তৈরি করতে পারি আমরা। এখানকার ফুল বিদেশে পাঠানোও কঠিন নয়। কিন্তু সরকারি কোনো সাহায্যই তো নেই। ফলে পুঁজির অভাব হয়ে যায়। বেশিরভাগ ফুলচাষিই বার্ষিক ইজারা ভিত্তিতে অন্যের জমিতে ফুল চাষ করেন।

ফুলচাষি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এক বিঘা জমিতে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার গোলাপ গাছ রোপণ করা যায়। এতে প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ হয়। এ ছাড়া পরিচর্যা ও পরিবহনে আছে বাড়তি ব্যয়। একবার চারা রোপণে ছয়-সাত বছর পর্যন্ত গোলাপ ফুল পাওয়া যায়। গ্ল্যাডিওলাস ফুল এক বিঘা জমিতে চাষ করা হলে প্রায় আট হাজার স্টিক পাওয়া যায়। এ ছাড়াও এখানে ডালিয়া, আলমেন্দা, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা ও রজনীগন্ধা ফুলের চাষ করা হয়। ফুলের ভরা মৌসুমে আমাদের নাওয়া-খাওয়ার সময় থাকে না। তবে এবার তুলনামূলক ফুলের চাহিদা ও দাম একটু কম। বর্তমানে গোলাপ ৮ থেকে ১০ টাকা পিস ও গাঁদা ৬০০-৭০০ টাকা প্রতি হাজার বিক্রি হচ্ছে। এক বিঘা জমির ফুল মৌসুমে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকায় বিক্রি করা যায়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর গাইবান্ধার উপ-পরিচালক মো. খোরশেদ আলম জানান, জেলায় এ বছর প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, গ্ল্যাডিওলাস, কসমস, চন্দ্রমল্লিকাসহ বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ করা হয়েছে। তবে জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে সাদুল্লাপুর উপজেলায় অত্যন্ত ভালো মানের ফুল চাষ হয় জানি। ওই এলাকার মাটি ও আবহাওয়া ফুল চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় জেলায় অধিকাংশ ফুলের আবাদ হয় সাদুল্লাপুরেই। এখানকার কয়েক শতাধিক কৃষক বাণিজ্যিকভাবে বারো মাস ফুল চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
সময়ের আলো//অনলাইন/১১.২.২৪