-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
মোবাইলে ভূতুড়ে ভ্যাস
বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর থেকে। এরপরই দেখা যায়, গ্রাহকের মোবাইল থেকে একটা চার্জ কেটে নিচ্ছে অপারেটররা। পরে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারে ফোন করলে মিষ্টি কণ্ঠে জানানো হয়-আপনার মোবাইল ফোনে একটি সার্ভিস যুক্ত আছে। কিন্তু কে, কখন, কেন ওই সার্ভিস যুক্ত করল, তা ব্যবহারকারী নিজেই জানেন না। ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসের (ভ্যাস) নামে ভূতুড়ে এ ‘সেবা’ কাণ্ডের আড়ালে গ্রাহকদের সঙ্গে হরহামেশাই ঘটছে এমন প্রতারণার ঘটনা। শিক্ষিত ও সচেতন ব্যক্তিরা এ হয়রানি থেকে বাঁচার উপায় খুঁজে বের করতে পারলেও অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে অল্পশিক্ষিত, অসচেতন ও বয়স্করা। ফলে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলছে মোবাইল অপারেটরদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ভ্যাসের এই ডাকাতি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গ্রাহকরা।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৯০ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহক ৮২ দশমিক ২৭ মিলিয়ন, রবি অজিয়াটা ৫৮ দশমিক ২৭, বাংলালিংকের ৪৩ দশমিক ৪৪ ও টেলিটকের গ্রাহক রয়েছে ৬ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন। এসব ব্যবহারকারীদের মোবাইলে ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসের নামে ওয়েলকাম টিউন, ইসলামি সার্ভিস, খেলার খবর, চাকরির খবর, স্টাডি লাইন, মিসড কল অ্যালার্ট, ওয়েলকাম টিউন, ই-বিল, গেমস, ভিডিও, গান, বিভিন্ন কনটেন্ট ও নিউজ সার্ভিসসহ মোবাইল অপারেটরদের বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে ভ্যাস অপারেটররা। তবে অভিযোগ রয়েছে, গ্রাহকের অনুমতি ছাড়াই তাদের ফোনে এসব সার্ভিস যুক্ত করে দিয়ে গ্রাহকের ব্যালেন্স থেকে অতিরিক্ত টাকা কেটে নিচ্ছে তারা। তবে অপারেটররা বলছেন, ২০২১ সালের পর থেকে তারা গ্রাহকের ডাবল কনসার্ন (দুবার অনুমতি) ছাড়া কোনো সার্ভিস অ্যাক্টিভেট করছেন না। একই সঙ্গে গ্রাহকের পছন্দ না হলে টাকাও ফেরত দিচ্ছেন তারা। এদিকে ১৩২টি প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাস রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট দিলেও গ্রাহকদের এসব অভিযোগের বিষয়ে নীরব রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকালে ৫টা। বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন শনির আখড়ার বাসিন্দা মহিদুল (৫০)। হঠাৎ তার ব্যবহৃত রবি সিমে একটি মেসেজ আসে। সেখানে লেখাÑ ‘ইউ হ্যাব সাকসেসফুললি অ্যাক্টিভেটেড দ্য স্টারজোন উইকলি অন-ডিমান্ড সার্ভিস অ্যাট বিডিটি ৯.৩৩। প্লিজ ডায়েল ২২২৮৮ টু ইনজয় দ্য সার্ভিস’। এই মেসেজের অর্থ, আপনি ৯.৩৩ টাকায় ‘স্টারজোন’ সাপ্তাহিক অন-ডিমান্ড পরিষেবাটি সফলভাবে চালু করেছেন। এরপর তিনি ব্যালেন্স চেক করে দেখেন, তার ব্যালেন্স থেকে ৯ টাকা ৩৩ পয়সা কেটে নেওয়া হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে মহিদুল রবির কাস্টমার কেয়ার নাম্বারে (০১৮১৯-৪০০৪০০) ফোন করে টাকা কেটে নেওয়ার বিষয়টি জানতে চান। রবি থেকে তাকে জানানো হয়, তার মোবাইল সংযোগে একটি সার্ভিস যুক্ত আছে। সে জন্য চার্জ কাটা হয়েছে।
মহিদুলের দাবি, তিনি তার মোবাইলে কোনো ধরনের সার্ভিস অ্যাক্টিভ করেননি। তার অজান্তেই তার মোবাইলে এই সার্ভিস চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে যাচাই-বাছাই করে কেটে নেওয়া ৯.৩৩ টাকা ফেরত দিয়েছে রবি। এরপর মেসেজে পাঠিয়ে রবির পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় তাদের সেবায় মহিদুল সন্তুষ্ট কি না। জবাবের মেসেজের জন্য কোনো চার্জ কাটা হবে না।
এই বিড়ম্বনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মহিদুল সময়ের আলোকে বলেন, আমি নিজ থেকে মোবাইলে কোনো সার্ভিস যুক্ত করিনি। অথচ আমার মোবাইল থেকে টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। রবিতে অভিযোগ করলে জানতে পারি, ‘স্টার লিংক’ নামে একটি ভ্যাস অপারেটর এই সার্ভিস আমার ফোনে যুক্ত করেছে। আমি নাকি গান শোনার জন্য সার্ভিসটি চালু করেছি। অথচ এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এ এক ভূতুড়ে কাণ্ড। অভিযোগ করলে পরে রবি দুঃখ প্রকাশ করে টাকা ফেরত দিয়ে সার্ভিসটি বন্ধ করে দেয়। আমি সচেতন বলে অভিযোগ করেছি। অনেকেই জানেন না তার ব্যালেন্স থেকে কেন টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। কোথায় অভিযোগ করতে হবে সেটিও জানেন না। বিটিআরসির লাইসেন্স নিয়ে ভ্যাস অপারেটররা রীতিমতো ডাকাতি করছে। অথচ বিটিআরসি কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তরুণ নামে আরেক গ্রাহক সময়ের আলোকে বলেন, ফোনে টাকা রিচার্জ করলেও কথা বলতে পারি না। একটা মেসেজ পাঠিয়ে টাকা কেটে নেওয়া হয়। মেসেজে লেখা থাকে ‘ইউ হ্যাব সাকসেসফুললি অ্যাক্টিভেটেড’। আমি একটি ফিচার (বাটন) ফোন চালাই। পরে মুঠোফোন গ্রাহক নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনকে আমার সমস্যার কথা জানালে তারা রবির সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাকে জানায়, আমার ফোনে নাকি ‘গেমস’, ‘ভিডিও’, ‘গান’ সহ তিনটি সার্ভিস যুক্ত আছে। বাটন ফোনে এসব সার্ভিস যুক্ত করে আমি কী করব? বাটন ফোনে তো এসব দেখা যায় না। অভিযোগের পর এসব সার্ভিস বন্ধ করে দিয়েছে।
শুধু রবি নয়, অন্য অপারেটরদের গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলেও ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসের নামে ডাকাতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে গ্রাহকদের এসব অভিযোগ মানতে রাজি নয় মোবাইল ফোন অপারেটররা। তাদের দাবি, গ্রাহকদের অজান্তে নয় বরং দুবার অনুমতি নিয়েই তাদের সংযোগে ভ্যাস সার্ভিস যুক্ত করা হয়। কারও অভিযোগ থাকলে সার্ভিস বন্ধ করে কাস্টমারের টাকাও ফেরত দেওয়া হয়।
গ্রাহকের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম সময়ের আলোকে বলেন, ২০২১ সালের পর থেকে প্রতিটি অপারেটর ডাবল কনসার্ন (দুবার অনুমতি) সিস্টেম ইমপ্লিমেন্ট করেছে। এর মানে হলো, গ্রাহকের কাছ থেকে দুবার অনুমতি নিয়েই এই সার্ভিস অ্যাক্টিভেট করে টাকা কাটা হয়। ডাবল কনসার্ন ছাড়া কোনো কাস্টমারের কাছ থেকে টাকা কাটা হয় না। এখন কাস্টমার যদি ফোন করে বলে, আমি যে সার্ভিসটি নিয়েছিলাম সেটি আমার ভালো লাগছে না। সে ক্ষেত্রে ভ্যাস অপারেটরদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি অনুযায়ী কাস্টমারদের টাকা ফেরত দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, যদি কোনো গ্রাহক এই সার্ভিস নেন তা হলে তার কাছে একটি মেসেজ যাবে। এরপর সে মেসেজে ডুকে ফোনের কি-বোর্ড চেপে যেকোনো একটি অক্ষর প্রেস করে মতামত দেবেন। তারপর কনসার্ন গেটওয়ে সেটা অ্যাপ্রুভ করে। কাস্টমারের কাছ থেকে অযাচিতভাবে টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে এটি ঠিক নয়। আমাদের যদি মনে হয় এটি কাস্টমার ভুল করে করেছেন, তা হলে আমরা টাকা ফেরত দিয়ে দেই। এরপরও যদি কাস্টমার বলে, আমি বুঝিনি, আমি করিনি, সে দায়িত্ব আমরা কতটুকু নেব তা আলোচনার বিষয়। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, অনুমতি ছাড়া কোনো ভ্যাস সার্ভিস অ্যাক্টিভেট হয় না।’
এদিকে গ্রাহকদের মোবাইলে অপারেটরদের মাধ্যমে ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভ্যাস) সংযোগ দিয়ে হয়রানি ও টাকা কাটা বন্ধে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি সংগঠন। চিঠিতে বলা হয়, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন প্রায় দুই শতাধিক ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস লাইসেন্স দিয়েছে। এসব লাইসেন্সের মাধ্যমে মোবাইলের রিংটোন, নিউজ পোর্টাল আপডেট, গান, বিনোদনমূলক কনটেন্ট, ভিডিও গেমসহ অসংখ্য সেবা সার্ভিস গ্রাহকদের চাহিদা মাফিক যুক্ত করে দিয়ে মোবাইল ব্যালেন্স থেকে নির্দিষ্ট চার্জ কেটে নেওয়া হয়। চার্জের এই অর্থ মোবাইল অপারেটর এবং নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসি পায়। কিন্তু এই সেবা সার্ভিসের নামে কয়েক বছর ধরে চলছে গ্রাহকের পকেট কাটা। বলা চলে ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসের নামে ডাকাতি। এসব অভিযোগ ওঠায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি তদন্ত করে বেশ কয়েকটি অপারেটরের বিরুদ্ধে কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ পায়। বিশেষ করে অভি কথাচিত্র নিউজ অ্যালার্ট টলিউড এবং ওয়েব সিরিজ ঝালমুড়ি, সেবার নামে ২০২০ সালে গ্রাহকদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে ৪৩ লাখ টাকা আদায় করে। একইভাবে পারপাল আদায় করে অন্তত ৩৩ লাখ টাকা। ওই সময় বিটিআরসি দুটি অপারেটরের লাইসেন্স বাতিল করে। কিন্তু অনৈতিকভাবে গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা সেই টাকা এখনও গ্রাহকদের ফেরত দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘বলা আছে কোনো সার্ভিস যুক্ত করতে হলে গ্রাহককে অন্তত দুবার ফোন করে কনফার্ম হতে হবে গ্রাহক সার্ভিসটি চায় কি না। অথচ গ্রাহক সার্ভিস চাক বা না চাক, তার তোয়াক্কা না করে অপারেটর গ্রাহকের মোবাইলে বিভিন্ন কনটেন্ট যুক্ত করে দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। যা পেনাল কোড ১৮৬০-এর টেলিকমিউনিকেশন আইন ২০০১ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’
তিনি বলেন, ‘আর অপারেটররা যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, তা সঠিক নয়। গ্রাহকের অজান্তেই টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। যদি তাই না হতো তা হলে তারা টাকা ফেরত দেয় কেন? আমরা প্রতিমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে এসব কথা জানিয়েছি। এখন মন্ত্রী এবং বিটিআরসি তদন্ত করে দেখুক। আমরা চাই গ্রাহকের অজান্তে যেসব অনৈতিক সেবার নামে অপারেটররা অর্থ আদায় করেছে, তাদের লাইসেন্স বাতিল করে শাস্তির আওতায় আনা হোক।’
বিষয়টি নিয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘সঠিক তথ্যের জন্য কয়েক দিন সময় দিতে হবে। তথ্য সবসময় হাতের কাছে থাকে না।’ তিনি বিটিআরসির সচিব ও মিডিয়া উইংয়ের প্রধান নূরুল হাফিজের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
এরপর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিটিআরসির সচিবের কাছে লিখিতভাবে কিছু তথ্য জানতে চাওয়া হয়। তবে তথ্য দিতে গড়িমসি করে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। অপারেটরদের কাছে চেয়েছি তারা দিলে দেব।’ এরপর গতকাল বুধবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
সময়ের আলো/শাকিল আহমেদ/ ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪