সেই ২০০০ সাল থেকে স্বচ্ছতার সাথে পথচলা...

May 16, 2026 6:03 am

মহানবী (সা.)-এর জন্ম-মৃত্যু এবং উম্মতের করণীয়

রবিউল আউয়াল শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রথম বসন্ত। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে এই রবিউল আউয়াল মাসেই বসন্তের ফুল হয়ে ধরণিতে আগমন করেছিলেন বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি রহমাতুল্লিল আলামিন, তথা বিশ্বজগতের জন্য শান্তির বাহক। দুনিয়া ও আখেরাত দুই জাহানের সর্দার তিনি। অনুপম এ মহামানবের জন্ম বিশ্ববাসীর জন্য পরম খুশি ও আনন্দের। ঘটনাক্রমে এই মাসেই তাঁর জন্ম এবং মৃত্যু দুটোই ঘটে। তাঁর জন্ম যেমন আনন্দের, তেমনি পৃথিবী থেকে তাঁর বিদায় নেওয়াটাও দুঃখ ও বেদনার।

৫৭১ খ্রিস্টাব্দে রবিউল আউয়াল মাসে কোনো এক সোমবার তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আর ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে একই মাস ও দিনে তথা রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে নবীজির (সা.)-এর জন্মতারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। কারও মতে রবিউল আউয়াল মাসের ২ তারিখ, কারও মতে ৮ তারিখ, কারও মতে ১০ তারিখ, কারও মতে ১২ তারিখ, কারও মতে ১৭ তারিখে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর মৃত্যুর তারিখ নিয়েও ঐতিহাসিকদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। কারও মতে রবিউল আউয়ালের ১ তারিখ, কারও মতে ২ তারিখ। আর অধিকাংশের মতে ১২ রবিউল আউয়াল মাসে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। তবে নবীজি (সা.)-এর জন্ম ও মৃত্যু যে রবিউল আউয়াল মাসের কোনো এক সোমবার হয়েছে-এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ইতিহাসবিদ উলামায়ে কেরাম একমত রয়েছেন (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ২/২৮২)। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বুঝে আসে-মুসলিম উম্মাহর জন্য রবিউল আউয়াল মাস একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনার। এ মাসের আগমন আমাদের হৃদয় ও মননে নবীজির প্রতি প্রেম-ভালোবাসা ও মহব্বত অন্য সময়ের চেয়ে আরও দৃঢ় করে। কিন্তু এর মানে এই নয়-কেবল এ মাসে নবীজি (সা.)-এর প্রতি মহব্বত দেখাব, অন্য সময় তাকে ভুলে যাব! বরং আজকের দিন থেকে আমাদের প্রতিজ্ঞা হবে-‘জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নবীজি (সা.) এর প্রতি মহবব্বত ও ভালোবাসা হৃদয় থেকে রাখব। তাঁর পথ ও আদর্শ অনুসরণ করে চলব। কারণ, তাঁর আদর্শ অনুসরণ ও অনুকরণেই আমাদের মুক্তি নিহিত।’

নবীজির অসাধারণ চারিত্রিক মাধুর্য ও অনুপম ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি দিয়ে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’ (সুরা আহজাব : ২১)। তিনি অবিস্মরণীয় ক্ষমা, মহানুভবতা, বিনয়-নম্রতা, সত্যনিষ্ঠতা প্রভৃতি বিরল চারিত্রিক মাধুর্য দিয়ে বর্বর আরব জাতির আস্থা অর্জন করেছিলেন। ফলে সবাই তাকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত করেছিল। দুনিয়ার মানুষকে অর্থ বা প্রভাব-প্রতিপত্তির দ্বারা বশীভূত করেননি। বরং স্বভাবজাত উত্তম ব্যবহার দিয়ে বশীভূত করেছিলেন। তাই তো তাঁর চারিত্রিক গুণাবলি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয় আপনি সুমহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।’ (সুরা কলম : ৪)

মানুষের অনুসরণীয় মডেল হিসেবে তাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহর ভালোবাসা প্রাপ্তি মহানবীর পরিপূর্ণ আনুগত্য ও অনুসরণের ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘হে রাসুল! আপনি লোকদের বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তা হলে আমাকে অনুসরণ করো। তা হলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন’ (সুরা আলে ইমরান : ৩১)। রাসুলকে ভালোবাসার নিদর্শন হচ্ছে তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ করা। তাঁর সুন্নত অনুযায়ী জীবনযাপন না করে নিজেকে আশেকে রাসুল বলে দাবি করা অর্থহীন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের সব লোকই জান্নাতি হবে অস্বীকারকারী ছাড়া। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! অস্বীকারকারী কে? রাসুল (সা.) বললেন, যে আমার অনুসরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার নাফরমানি করবে, সেই অস্বীকারকারী।’ (বুখারি : ৬৮৫১)

মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এই মাসে উৎসব বা শোক পালন বড় কথা নয়; আসল কথা হলো তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা; কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা; একমাত্র ইসলামকেই ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির অনন্য পথ হিসেবে গ্রহণ করা। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা : ‘যা দিয়েছেন তোমাদের রাসুল (সা.), সুতরাং তা ধারণ করো; আর যা থেকে বারণ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকো’ (সুরা: হাশর : ৭)। আল-কুরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘বলুন (হে রাসুল সা.!) যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসবে, তবে আমার অনুকরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন’ (সুরা : বাকারা : ৩১)। হাদিস শরিফে আছে, ‘তোমরা কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমি হব তাঁর কাছে তাঁর পিতা, পুত্র ও সব মানুষ (এবং যাবতীয় সবকিছু) থেকে প্রিয়।’

তাই আসুন, আজ প্রতিজ্ঞা করি-নবীজির প্রতিটি নির্দেশনা মেনে চলব। ঠিকমতো ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত আমল পালন করব। ঘুষ, দুর্নীতি, লোভ, হিংসা, মিথ্যা ইত্যাদি বদ কাজগুলো পরিহার করব। আল্লাহ আমাদের বোঝার ও আমল করার তওফিক দান করুন।