-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
সেন্টমার্টিনে স্থবির পর্যটন ব্যবসা
পর্যটনের স্থান সেন্টমার্টিনে অটো চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন গত ৮ বছর ধরে। দ্বীপটিতে পর্যকট যাওয়া বন্ধ করায় কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন তিনি। আয়-রোজগার বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দুই সন্তান ও পরিবার-পরিজনের জন্য তিন বেলার খাবার তিনি জোটাতে পারছেন না এখন। সংসার চালাতে তিনি তার স্ত্রীর স্বর্ণের কানের দুল বিক্রি করেছিলেন। সে অর্থও শেষ। যখন অনেক পর্যটক আসত, তখন প্রতিদিন তার আয় ছিল ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা। এখন সারা দিনে আয় হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। যা দিয়ে এই উচ্চমূল্যের বাজারে এক বেলারই খাবার কেনা যাচ্ছে না। তাই চরম মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে সেন্টমার্টিনের এই অটোচালককে।
শুধু মোহাম্মদ ইউনুস নয়, এই দ্বীপে বসবাসরত ২১০০ পরিবারের ১০ হাজার ৭০০ মানুষের সবারই কমবেশি একই দশা। ৫৫ বছর বয়সি মাহবুব আলম নিজের বসতবাড়িকে কয়েকটি রুম বানিয়ে ছোট্ট রিসোর্ট হিসেবে ভাড়া দেন পর্যটকদের কাছে। বছরের চার মাসের পর্যটন মৌসুমে যে আয় করেন সেটি দিয়েই বাকি আট মাসের সংসার খরচ, সন্তানের লেখা-পড়াসহ সব ব্যয় মেটান তিনি। এ বছর পর্যটন মৌসুমে সরকার সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাওয়া বন্ধ করায় তারও আয়-রোজগার একেবারে কমে গেছে। কারণ আগের মাছ ধরা পেশা ছেড়ে দিয়েছেন মাছ না পাওয়ার কারণে। তিন থেকে চার ঘণ্টা সাগরে জাল ফেলেও এক কেজি মাছ জোটে না এখন। পৈতৃক সূত্রে কিছু কৃষিজমি ছিল, সেগুলোও বিক্রি করা হয়েছে, কৃষিকাজও করতে পারেন না। তাই এখন তিনি পুরোপুরি নির্ভর এই পর্যটন ব্যবসার ওপর। পর্যটক না আসায় তার রোজগার একেবারে বন্ধ। দুই মাস ধরে তার দুই সন্তান যে মাদরাসায় পড়ত, বেতন দিতে না পারায় তাদের মাদরাসায় যাওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ এখন তিন বেলার খাবারের টাকাই জোগাড় করতে পারছেন না, সেখানে সন্তানের লেখা-পড়ার খরচ কীভাবে জোটাবেন। এ কথা বলে মাহবুব আলম আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না।
ঢুকরে কেঁদে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ‘জীবনে এ রকম কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হব কখনো ভাবিনি। আমার সন্তানের মুখে তিন বেলার খাবার দিতে পারছি না, সন্তানের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার আমাদের মতো গরিবের পেটে কেন লাথি মারছে আমার বুঝে আসে না। আমাদের মূল আয়ের পথটিই যদি বন্ধ হয়ে যায়-তা হলে আমরা কী খাব, কোথায় যাব।’
এই দ্বীপের আরেক বাসিন্দা মৌলভী আবদুর রহমান। যার আগের পৈতৃক পেশা ছিল মাছ ধরা ও বিক্রি করা। সেন্টমার্টিনে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটার পর আগের সব পেশা ছেড়ে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে পর্যটকদের থাকা ও খাওয়ার জন্য কটেজ নির্মাণ করেছেন। পর্যটক না আসায় তারও ব্যবসা একেবারে বন্ধ। এই দ্বীপ থেকে প্রথমবারের মতো তার দুই মেয়ে ঢাকার দুটি বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি হতে পেরেছেন। দ্বীপবাসী স্বপ্ন বুনছেন তাদের দ্বীপের দুই মেয়ে ডাক্তার হবে। টাকার অভাবে তাদের সে স্বপ্ন ফিকে হতে চলেছে।
আবদুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘পর্যটক আসা বন্ধ করে সরকার আমাদের পথে বসিয়ে দিয়েছে। আমার বড় আশা নিয়ে আমার দুই মেয়েকে ডাক্তারি পড়াতে ঢাকায় পাঠিয়েছি। গত দুই মাস ধরে তাদের লেখা-পড়ার খরচ দিতে পারছি না। মেয়েদের বলে দিয়েছি, আমি হয়তো তোমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারব না, তোমাদের লেখা-পড়ার খরচ দিতে পারছি না। এটা যে আমাকে কী ধরনের পীড়া দিচ্ছে বলে বোঝাতে পারব না। আগের সরকারের মতো এখনও আমাদের পেটে লাথি মারছে। আমরা এখন কী খাব-কোথায় যাবে, কী করব-কিছুই বুঝতে পারছি না। তাই সরকারের কাছে করজোড় মিনতি করছি-সেন্টমার্টিনে পর্যটক আসতে দিন-আমাদের পেটে আর লাথি মেরেন না।’
সেন্টমার্টিনকেন্দ্রিক ট্যুর অপারেটর জাভেদ রহমান সময়ের আলোকে বলেন, সরকার পর্যটক নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে আমরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। কারণ প্রতিটি মৌসুম শুরুর আগে কটেজগুলো প্রস্তুত করতে একেকটিতে ১ লাখ, দশটিতে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। পর্যটক যদি না আসতে পারে তা হলে তো এই খরচের টাকাই তুলতে পারবে না। তাই আমরা চাচ্ছি সরকার যেন প্রতিদিন ২ হাজারের বদলে ৪ হাজার পর্যটক আসার অনুমতি দেয়।
পর্যটক বিষয় সংক্রান্ত কমিটি গঠন : এদিকে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন নিয়ন্ত্রণ ও সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ ছাড়ার পয়েন্ট নির্ধারণ সংক্রান্ত কমিটি গঠন করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ২২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রাণলয়ের সভায় সেন্টমার্টিনের বিষয়ে নানা বিধি নিষেধ আরোপ করে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে গত ২৮ অক্টোবর একই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আসমা শাহীন স্বাক্ষরিত একটি পরিপত্র জারি করে।
এনআইডি ও লিখিত অনুমতি : সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী নভেম্বর মাসে সেন্টমার্টিন ভ্রমণে বাধা থাকার কথা নয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেখানে বেড়াতে যাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে নিজ এলাকায় প্রবেশ করতে হচ্ছে।
ক্ষোভ অসন্তোষ : সেন্টমার্টিন দ্বীপে এসে দেখা যায় বেশিরভাগ দোকানপাট, পর্যটনকে ঘিরে নির্মিত হোটেল রেস্তোরাঁ সব বন্ধ। দ্বীপ ঘুরে দেখা যায় অধিকাংশ কটেজ, হোটেল রিসোর্ট পর্যটনের জন্য প্রস্তুত নয়। সবই বন্ধ। ভ্রমণে এই কড়াকড়ি নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেন দ্বীপের স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী এবং বাইরে থেকে যাওয়া বিনিয়োগকারীরা।
বাইরে থেকে যারা পর্যটন খাতে দ্বীপে বিনিয়োগ করেছেন তারা পড়েছেন মারাত্মক বিড়ম্বনায়। পর্যটনের প্রস্তুতি, সেবা দেওয়ার জন্য স্টাফ আনারও সুযোগ হচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হলো। নভেম্বর মাসে পর্যটন শুরু করার প্রস্তুতি নিয়ে দ্বীপে এসেছিলেন আরিফুর রহমান রিমন। পর্যটন শুরু না হওয়ায় বাধ্য হয়ে ঢাকায় ফিরে গেছেন। তিনি বলেন, ভ্রমণের অনুমতি না থাকায় বাইরে থেকে স্টাফ এনে রিসোর্টের যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারছেন না তার মতো অনেকেই।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলমের অভিযোগ দোকানের মালামাল কিনে আনতেও কোস্ট গার্ডের অনুমোদন লাগছে। তিনি বলেন, ‘সার্বভৌম দেশ, স্বাধীন দেশ, আমি যদি এখান থেকে বাংলাদেশের প্রত্যেকটা জেলায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেতে পারলে, আমার সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের অংশ হয়ে স্বাধীনভাবে আমার বাংলাদেশের লোকজন আসতে পারবে না কেন।’
সার্বিক বিষয় সম্পর্কে টেকনাফ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফ উল্লাহ নেজামী সময়ের আলোকে বলেন, ‘সরকারের তরফ থেকে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। আমরা কাজ শুরু করেছি, কীভাবে সেন্টমার্টিনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পর্যটক নিয়ে যাওয়া যায়। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এ বিষয়ে একটি ভালো সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’
*এসএম আলমগীর, সেন্টমার্টিন থেকে ফিরে
সময়ের আলো/২১ নভেম্বর, ২০২৪