-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
দ্বিধাদ্বন্দ্বে অন্তর্বর্তী সরকার
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র ঘোষণা দেওয়া না দেওয়া নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে অন্তর্বর্তী সরকার। ইতিমধ্যে ঘোষণাপত্রে সংবিধান ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতানৈক্য তৈরি হয়েছে সরকারের। ফলে এ ঘোষণাপত্র কোন পদ্ধতিতে করলে সর্বজনগ্রহণযোগ্য হবে তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে প্রফেসর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা বলেছেন, জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রের দাবিতে আমাদের কেন্দ্রঘোষিত গণসংযোগ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। আজ ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি চলবে। এরমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পেলে আমরা পরবর্তী কর্মসূচি কী হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।
অন্যদিকে গত ৩১ ডিসেম্বর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা ঘোষণাপত্র ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ওই সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র দেবে সরকার। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা আজ ১৫ জানুয়ারির মধ্যে এ ঘোষণাপত্র দেওয়ার আলটিমেটাম দেন। অবশ্য এরপর সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই ঘোষণাপত্র জারি করবে না, বরং সরকার এ প্রক্রিয়াকে ফ্যাসিলিটেট করবে।
কিন্তু আজ ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এমনকি এ ঘোষণাপত্র কবেনাগাদ দেওয়া হবে এ নিয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্তও হয়নি। এমনকি দেশের কোনো রাজনৈতিক দল বা অংশীজনের সঙ্গে সরকার আলোচনাও করেনি। বরং সরকার আরেকটু ভেবে-চিন্তে এ ঘোষণাপত্র দিতে চায়। সরকার রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে ঘোষণাপত্র দেবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আগামীকাল বৃহস্পতিবার সর্বদলীয় বৈঠক করতে চায় সরকার।
গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্রে সংবিধান ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতানৈক্য তৈরি হয়েছে। গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে সংবিধান পুনর্লিখন হবে, নাকি পরবর্তী নির্বাচিত সংসদ সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার করবে এ নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। সম্প্রতি সংবিধান সংস্কার কমিশনের কাছে বিদ্যমান সংবিধান সংশোধন নয়; বরং সংবিধান পুনর্লিখনের প্রস্তাব দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। বিএনপি ও বামপন্থিদের বড় একটি অংশ সংবিধান বাতিল বা সংস্কারের বিপক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে ইসলামপন্থিদের বড় একটি অংশ সংবিধান বাতিল বা পুনর্লিখন নিয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে। এ নিয়ে রাজনীতিতে চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি গত ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করতে চেয়েছিল। এমন প্রেক্ষাপটে ৩০ ডিসেম্বর রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি ঘোষণাপত্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এরপর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘোষণাপত্র প্রকাশের পরিবর্তে ৩১ ডিসেম্বর বিকালে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ (ঐক্যের জন্য যাত্রা) নামে সমাবেশ করে। ওই সমাবেশ থেকে ঘোষণাপত্র প্রকাশের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়।
পরে ৪ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা জানান, ঘোষণাপত্রের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে ৬ থেকে ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত জেলায় জেলায় মানুষের কাছে লিফলেট বিতরণ, সমাবেশ ও জনসংযোগ করা হবে। এ কর্মসূচির নাম দেওয়া হয় ‘ঘোষণাপত্র সপ্তাহ’। এর মধ্যে ৭ জানুয়ারি এক বিজ্ঞপ্তিতে এই কর্মসূচি ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানোর কথা জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা সময়ের আলোকে বলেন, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র প্রকাশ নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে।
অবশ্য জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র প্রকাশের দাবিতে কর্মসূচির অংশ হিসেবে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। এ লিফলেটে জুলাইয়ের ঘোষণাপত্রে সাতটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং আহত ব্যক্তিদের বিনামূল্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুচিকিৎসা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট করা; ঘোষণাপত্রে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা; অভ্যুত্থানে আওয়ামী খুনি ও দোসরদের বিচার নিশ্চিত করার স্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করা; ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি সংবিধান বাতিল করে নির্বাচিত গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা এবং বিদ্যমান ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো বিলোপ করতে সব ধরনের সংস্কারের ওয়াদা দেওয়া।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩১ ডিসেম্বর শহিদ মিনারে শহিদ পরিবার এবং আহত যোদ্ধারা ঘোষণা দিয়েছেন, নতুন সংবিধান তৈরি করতে বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন হবে গণপরিষদ নির্বাচন। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তাড়াহুড়ো করে নির্বাচনের জন্য দুই হাজার মানুষ জীবন দেয়নি, গুলিতে পঙ্গু হয়নি ২৫ হাজার মানুষ। মানুষ স্বৈরাচারের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে একটি নতুন বাংলাদেশ পাওয়ার জন্য জীবন দিয়েছেন। ’৭২-এর সংবিধানে অধিকারের কথা নেই। তারা সেই সংবিধান চান না। ’৭২-এর সংবিধান বাতিল করতে হবে। নতুন করে সংবিধান লিখতে হবে। পিলখানা হত্যাকাণ্ড শাপলায় হেফাজত হত্যাকাণ্ড, সবশেষ চব্বিশের জুলাইয়ে গণহত্যার বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। আওয়ামী লীগের বিচারের আগে দেশে কোনো ভোট হবে না।
অন্যদিকে মঙ্গলবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টা প্রেস উইংয়ের সংবাদ ব্রিফিংয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র নিয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার সর্বদলীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনার স্থান এখনও নির্ধারিত হয়নি। খসড়া ঘোষণাপত্র নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অনির্ধারিত আলোচনা হয়েছে। বিএনপি, জামায়াত ও গণতন্ত্র মঞ্চসহ রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার সঙ্গে অনির্ধারিত আলোচনা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমিন সময়ের আলোকে বলেন, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র নিয়ে সরকার এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো আমন্ত্রণ জানানোর প্রয়োজনীয়তা মনে করেনি। এমনকি আমাদের কোনো আপডেটও জানায়নি। গত ৩১ ডিসেম্বর আমরা জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র দিতে চাইলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা এ ঘোষণাপত্র দেবে। তখন আমরা ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আলটিমেটাম দিই। পরবর্তীকালে সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের কথা বলা হয়েছে। সরকার বলেছে, জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সরকারের সম্পৃক্ততা নেই। তারা এ ঘোষণাপত্র দেবে না। পরে আবার বলেছে, দেশের রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র দেওয়া হবে। অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই ঘোষণাপত্র জারি করবে না, বরং সরকার এ প্রক্রিয়াকে ফ্যাসিলিটেট করবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে সময় চেয়েছে। সে সময় কতটুকু তাও স্পষ্ট করেনি। কিন্তু এই ঘোষণাপত্রের দাবিতে আমাদের যে কর্মসূচি তা চলমান রয়েছে। আজ ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে। আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। পরে আমরা বসে সিদ্ধান্ত নেব কী কর্মসূচি নেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, এখনও জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র নিয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। আজ ১৫ জানুয়ারি আমরা সংবাদ সম্মেলন করব। এই সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।
প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ সময়ের আলোকে বলেন, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র নিয়ে কাজ করছেন উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। দেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে এ ঘোষণাপত্র হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ছাত্রদের একটা অংশ ঘোষণাপত্র দিতে চেয়েছে। কিন্তু পরে দেখলাম সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তারাই ঘোষণাপত্র দেবে। আসলে একটা অংশ কী ঘোষণাপত্র দেবে বা সরকার কী দেবে আমরা এখনও জানি না। এখন পর্যন্ত সরকার আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেনি বা আলোচনার জন্য ডাকেনি।
উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা ঘোষণার এক মাসের মধ্যে ১০ এপ্রিল একটি ঘোষণাপত্র দেওয়া হয়েছিল। এর ওপর ভিত্তি করেই ৭২-এর সংবিধান প্রণয়নের আগ পর্যন্ত দেশ পরিচালিত হয়েছে।
সমীরণ রায়
সময়ের আলো/১৫ জানুয়ারি, ২০২৫