-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব রুখতে করণীয় কী
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যখাতে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৬৭৬, এবং মারা গেছে প্রায় ৩৪ জন। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটেছে রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে, যেখানে ১৫ শিশুর প্রাণহানি হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা ও গোপালগঞ্জে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এসব তথ্য স্বাস্থ্য অধিদফতর ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনের কারণ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের হঠাৎ প্রাদুর্ভাবের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণ হলো শিশুর অপুষ্টি এবং নিয়মিত টিকাদানের ঘাটতি। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়ে প্রথম ডোজের জন্য ৮৫% এবং দ্বিতীয় ডোজের জন্য ৮২% হয়েছে। সংক্রমণ রোধের জন্য সাধারণত ৯০-৯৫% টিকাদান প্রয়োজন। এই কম কাভারেজের কারণে কয়েক লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে, যারা এখন সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে।
এছাড়া, ২০২৫ সালে সেক্টর প্রোগ্রামের হঠাৎ বন্ধও পরিস্থিতি জটিল করেছে। ১৯৯৮ সাল থেকে চলা এই প্রোগ্রাম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভ্যাকসিন সঠিকভাবে বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। অনেক ইউনিয়ন ওয়ার্ডে ঠিকমতো টিকাদান কার্যক্রম চালানো যায়নি। একই সময়ে পরিকল্পিত বিশেষ হামের টিকাদান ক্যাম্পেইনও টাইফয়েড ভ্যাকসিনেশন ও অন্যান্য কারণে অনুষ্ঠিত হয়নি। এর ফলে দেশে ভ্যাকসিন সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয় এবং শিশুদের বড় অংশ টিকার বাইরে থেকে যায়।
সংক্রমণের প্রকৃতি ও ঝুঁকি
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী জানান, হাম অত্যন্ত সংক্রামক। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে গড়ে ১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে। তাই সংক্রমণ রোধে দ্রুত টিকাদান অপরিহার্য। তিনি আরও বলেন, নতুন টিকা দিলে সাধারণত ১০ দিনের মধ্যে শরীরে সুরক্ষা তৈরি হয়, আর আগে টিকা নেওয়া থাকলে ৫-৬ দিনের মধ্যেই ইমিউনিটি তৈরি হয়। এই কারণে যত দ্রুত সম্ভব শিশুদের টিকার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, হঠাৎ টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ বা কম হলে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়াতে পারে। বর্তমান প্রাদুর্ভাবই এর নিদর্শন। একবার সংক্রমণ বেড়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায় এবং শিশুদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
করণীয় ও পদক্ষেপ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার জুন মাস থেকে মাসব্যাপী বিশেষ হামের টিকাদান ক্যাম্পেইন চালাবে। এর আওতায় ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সি প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ক্যাম্পেইন শুধু সংক্রমণ রোধ করবে না, বরং শিশুদের জীবনও রক্ষা করবে।
তাদের মতে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আরও কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। আক্রান্ত শিশুদের আলাদা ওয়ার্ডে রাখা এবং আইসোলেশন নিশ্চিত করা, হাসপাতালগুলোতে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা, চিকিৎসকদের জন্য জাতীয় গাইডলাইন ও প্রশিক্ষণ প্রদান, স্কুল ও ডে-কেয়ারে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানা এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজীর আহমেদ বলেছেন, হঠাৎ কোনও চলমান জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি বন্ধ বা টিকাদান হঠাৎ কমে গেলে প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিনি সতর্ক করেছেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি পুনরায় ঘটলে যক্ষ্মা, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া বা এইচআইভি’র মতো রোগের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী আরও বলেন, যত দ্রুত সম্ভব শিশুদের টিকার আওতায় আনা হলে ৫-১০ দিনের মধ্যে শরীরে সুরক্ষা তৈরি হয়। তাই জুন মাসে শুরু হতে যাওয়া বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন যথেষ্ট হলেও আরও দ্রুত পদক্ষেপ নিলে শিশুদের জীবন রক্ষা সম্ভব।
ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টিকাদান কার্যক্রমের স্বাভাবিক হার বজায় রাখা ছাড়া হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। টিকা ছাড়াও হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থার মান, পর্যাপ্ত লজিস্টিক, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। শুধুমাত্র এই পদক্ষেপগুলো সমন্বয় করলে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি পুনরায় এড়ানো সম্ভব।
দেশের শিশুদের জন্য হামের প্রাদুর্ভাব একটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। দ্রুত টিকাদান, মানসম্মত চিকিৎসা এবং সচেতনতার মাধ্যমে এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। প্রতিটি পরিবার ও স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক এবং দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে সংক্রমণ কমানো যায় এবং শিশুর জীবন রক্ষা করা যায়।
/ইউএমএইচ
সময়ের আলো ডেস্ক
৩১ মার্চ, ২০২৬