সেই ২০০০ সাল থেকে স্বচ্ছতার সাথে পথচলা...

May 16, 2026 4:31 am

‘হজের খুতবা বাংলা ভাষায় উপস্থাপন করা গৌরবের’

শনিবার রাত ১১টা। মক্কার ইবরাহিম খলির রোডের মাঝামাঝিতে দাঁড়িয়ে আছি। অপেক্ষা একজন সৌভাগ্যবান মানুষের, যিনি এবার পবিত্র হজের মূল খুতবা বাংলা ভাষায় উপস্থাপনা করবেন। তিনি আমাদের দেশের গর্ব ড. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাক্কী।

৫ জুন অনুষ্ঠিত হবে পবিত্র হজ। আরাফার মাঠে এবার হজের খুতবা দেবেন কাবা শরিফের ইমাম ও খতিব ড. শায়খ সালেহ বিন হুমাইদ। খুতবাটি হারামাইন শরিফাইনের তত্ত্বাবধানে বাংলাসহ ৩৪টি ভাষায় অনুবাদ হয়ে লাইভ সম্প্রচার হবে। এ বছর বাংলা ভাষায় অনুবাদের দায়িত্ব পেয়েছেন ড. খলিলুর রহমান, আ ফ ম ওয়াহিদুর রহমান, মুবিনুর রহমান ও নাজমুস সাকিব। এদের মধ্যে লাইভ উপস্থাপনা করবেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি গত বছরও হজের খুতবা বাংলায় উপস্থাপন করেছেন।

হজ যেহেতু সন্নিকটে, ড. খলিলুর রহমানদের ব্যস্ততাও অনেক বেশি। তবু তিনি সময়ের আলোর পাঠক-দর্শকদের একটু সময় দিলেন। আমরা মুন্সিয়া রোডের মিসফালা-৪ হোটেলের লবিতে বসলাম। তিনি শোনালেন খুতবার অনুবাদ ও উপস্থাপনার নানা গল্প। জানালেন এ কাজের চ্যালেঞ্জ ও শঙ্কার কথা।

তিনি বললেন, ‘আমি ২০২২ সাল থেকে মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববি বিষয়ক জেনারেল প্রেসিডেন্সির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পবিত্র হজে আরাফার ময়দানের খুতবা, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা, দুই ঈদের খুতবা, সালাতুল হাজাত, সালাতুল ইস্তেখার খুতবা এবং বায়তুল্লাহর সব ধরনের খুতবা অনুবাদ ও উপস্থাপনাসহ বেশ কিছু দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছি। হারামাইন কর্তৃপক্ষ আমার ওপর আস্থা রেখে এ দায়িত্ব দিয়েছেন। ২০২৪ সালে প্রথম হজের খুতবা বাংলা ভাষায় উপস্থাপন করি। ইনশাআল্লাহ এ বছরও করার সুযোগ এসেছে। সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করি, যেন গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে পারি।’

ড. খলিলুর রহমান মাক্কী বলেন, ‘হজের খুতবা অনুবাদ কার্যক্রম একটি সম্মানের কাজ। এর মাধ্যমে বাংলাভাষী মুসলিমদের কাছে ইসলামের সুমহান বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে আমরা চারজন বাংলাদেশি দায়িত্বটি পালন করছি। একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমি মনে করি, হজের খুতবা নিজ ভাষায় শুনতে পাওয়া একটি গৌরব ও সম্মানের বিষয়। আশা করি, বাংলাভাষী মুসলিমরা হারামাইন থেকে সম্প্রচারিত খুতবা নিজ ভাষায় শুনবেন। মানারাতুল হারামাইন ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেলসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা শোনা যাবে। বাংলা ভাষাভাষী কতজন এ খুতবা শুনছেন, হারামাইন কর্তৃপক্ষ তা কাউন্ট করে। যদি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মানুষ না শোনেন, তা হলে এই সুযোগ যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই অনুরোধ করব অধিক মানুষ যেন শোনেন।’

খুতবা অনুবাদ ও লাইভ সম্প্রচারের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কাজটা খুবই সেনসেটিভ। কারণ আমাদের কাছে ১-২ দিন আগে লিখিত যে খুতবা আসে সেটার তো একটা অনুবাদ আমরা করি। কিন্তু খতিব যখন খুতবা প্রদান করেন, তখন কিছু পরিবর্তন তিনি করেন। ভাষা ও বক্তব্যে কিছু পরিবর্তন আসে। অনেক সময় কিছু অংশ বাদ দিয়ে নতুন কিছু দোয়া সংযোজন করেন। তখন আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হয়। খতিবের প্রত্যেকেটা লাইন ও শব্দ হিসাব করে করে অনুবাদ করতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, আমরা ইউটিউব দেখে লাইভ অনুবাদ করছি, কিন্তু কিছু শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না। তখন খুবই সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হয়।’

বাংলা ভাষাভাষী মানুষ সহজে কীভাবে এ খুতবা শুনবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেকোনো ডিভাইস থেকে মানারাতুল হারামাইন (https://manaratalharamain.gov.sa/) ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে একটি ভাষা নির্বাচন করলে খুতবার অনুবাদ শোনা যাবে। তা ছাড়া মানারাতুল হারামাইন মোবাইল অ্যাপ, আল কুরআন চ্যানেল ও আস সুন্নাহ চ্যানেলসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইউটিউব চ্যানেল (https://www.youtube.com/tubesermon), ফেসবুক ও টুইটারে তা শোনা যাবে। আর ওয়েবসাইটে বিগত বছরের খুতবা ও এর অনুবাদও পাওয়া যাবে।’

গল্প-আলাপ শেষ করার আগে ড. খলিলুর রহমানের গ্রামের বাড়ি ও পড়াশোনা সম্পর্কে জানমে চাই। তিনি বলেন, ‘চাঁদপুর জেলার হাইমচর উপজেলাধীন গাজীপুর ইউনিয়নের বাজাপ্তী গ্রামে ১৯৭২ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করি। ১৯৯২ সালে মেঘনা নদীর ভাঙনে আমাদের বাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেলে পরিবারসহ কুমিল্লা শহরের শাসনগাছায় চলে আসি এবং এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করি। প্রাথমিক পড়াশোনা নিজ গ্রামেই। কুমিল্লার ধামতী ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা থেকে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পড়ি। তারপর কিছু দিন নওগাঁ নামাজগড় গাউছুল আজম বহুমুখী আলিয়া মাদরাসায় হেড মুহাদ্দিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করে উচ্চ শিক্ষার জন্য স্কলারশিপ নিয়ে মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসি। এখান থেকেই মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করি।’

সবশেষে তিনি আবারও দোয়া চান। ৩ দিন পরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া হজের খুতবার দায়িত্ব যেন যথাযথভাবে পালন করতে পারেন। আমিও সারা বিশ্ব থেকে আসা হজযাত্রীদের হজ কবুল ও দেশের মানুষের কল্যাণের দোয়া চেয়ে কথার ইতি টানি।

আমিন ইকবাল
সময়ের আলো/এমএইচ
২ জুন, ২০২৫

আরও - ইসলাম সংবাদ