-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
বায়তুল মোকাররমে ৫ হাজার মুসল্লির অনন্য ইফতার
রমজান মাসজুড়ে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব ও দক্ষিণ চত্বরে দেখা যায় ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির অনন্য দৃশ্য। হাজার হাজার মুসল্লি একসঙ্গে ইফতার ভাগাভাগি করেন এক কাতারে সমবেত হয়ে।
শনিবার পবিত্র রমজানের তৃতীয় ইফতারিতে দেখা গেছে, সাজানো বড় প্লেট ঘিরে পাঁচ থেকে সাতজন রোজাদার গোল হয়ে বসে আছেন, আবার কেউ লম্বা লাইনে বসে আজানের অপেক্ষায় আছেন। সামনে বড় প্লেটে সাজানো ইফতারসামগ্রী। আপেল, কমলা, কলা, বুট, মুড়ি, বেগুনিসহ নানা পদের খাবার।
এ ইফতারের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে অংশ নেন দিনমজুর ও ভিক্ষুক থেকে উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্তের মানুষ। তাদের মধ্যে নেই কোনো ভেদাভেদ। নেই কোনো বৈষম্য বা হিংসা-বিদ্বেষ। বসার বা খাবারের আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই কারও জন্য। এত মানুষের সঙ্গে বসে ইফতার করতে পেরে যেন তাদের আনন্দের কোনো শেষ নেই। ইফতারকে লক্ষ্য করে জাতীয় মসজিদ এ সময় পরিণত হয় ধনী-গরিবের মিলন মেলায়। যেন এক ভিন্ন আবহের সৃষ্টি হয়।
গতকাল বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বায়তুল মোকাররম মসজিদের দোতলায় পূর্ব সাহানে (চত্বরে) এবং মসজিদের দক্ষিণ অংশে তিন ভাগে আয়োজন হচ্ছে প্রায় তিন হাজার মানুষের ইফতারি। দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মসজিদের পূর্ব সাহানের উত্তর দিকে ইফতারির আয়োজন করছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, দক্ষিণ দিকে ইফতারির আয়োজন করছে বায়তুল মোকাররম মসজিদ মুসল্লি কমিটি এবং মসজিদের দক্ষিণ অংশে ইফতারির আয়োজন করছে বাংলাদেশ মুসল্লি কমিটি।
এ ছাড়া সেখানে তাবলিগ জামাতের পক্ষ থেকেও নিয়মিত ইফতারের আয়োজন করা হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইফতারির আয়োজনে গিয়ে কথা হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা জামাল উদ্দীনের সঙ্গে।
তিনি জানান, বরাবরের মতোই এবারও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রতিদিন ইফতারির আয়োজন করা হচ্ছে। প্রতিদিন এক-দেড় হাজার মানুষ ইফতারি করেন তাদের আয়োজনে। অপরদিকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের মুসল্লি কমিটির সেক্রেটারি আলী আহমেদ বলেন, রমজানের পুরো মাসব্যাপী প্রায় দুই-আড়াই হাজার মুসল্লির ইফতারির আয়োজন করছেন তারা। প্রথম দিন প্রায় বারোশ থেকে দেড় হাজার মানুষের আয়োজন থাকলেও কয়েক দিন পর থেকে সেটা আরও বাড়বে।
এ ছাড়া বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ চত্বরে দেখা যায় গণ-ইফতারির আরেকটি আয়োজন করছে বাংলাদেশ মুসল্লি কমিটি নামের আরেকটি সংগঠন। সংগঠনটির দায়িত্বশীল পীর ফজলুল হক জানান, তাদের উদ্যোগে প্রতিদিন প্রায় হাজারের মতো মানুষের ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া বায়তুল মোকাররম মসজিদের স্থানীয় তাবলিগ জামাতের পক্ষ থেকেও পুরো মাসব্যাপী ৫০০ থেকে ৭০০ মানুষের ইফতারির আয়োজন করা হয়। অনেক বছর ধরেই তারা এভাবে মুসল্লিদের ইফতারি করাচ্ছেন, জানান মসজিদের তাবলিগ জামাতের একজন জিম্মাদার।
শনিবার সরেজমিন দেখা গেছে, আসরের নামাজের পর থেকে অনেকেই আর বাইরে যাননি। একপাশে স্টেজে মাইক সামনে নিয়ে কুরআন তেলাওয়াত হচ্ছিল। মুসল্লিরা তেলাওয়াত শুনছিলেন। সময় যত গড়াচ্ছিল রোজাদারদের সংখ্যাও তত বাড়ছিল। কেউ নামাজের সারির মতো লম্বা লাইন করে বসছিলেন। কেউ বসছিলেন বৃত্তাকারে। ততক্ষণে ইফতার তৈরিতে স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যস্ততাও বেড়ে যায়। আশপাশের দোকানের কর্মচারী, গুলিস্তান এলাকায় কেনাকাটা করতে আসা সাধারণ মানুষ, ভিক্ষুক, ভবঘুরে, এতিম-মিসকিন সবাই অপেক্ষা করতে থাকেন ইফতারের জন্য। কেউ ঢাকার বাইরে থেকে আসেন নানা কাজে। ইফতার পরিবেশনসহ অন্যান্য কাজেও অংশ নিচ্ছিলেন তারা। কে নেই এখানে? ধনী-গরিব, শিক্ষার্থী থেকে চাকরিজীবী, রিকশাচালক, ব্যবসায়ী, ছিন্নমূল মানুষসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ শামিল হন এই ইফতারে।
তেমনি একজন চাকরিজীবী নুরুল ইসলাম। তিনি যাত্রাবাড়ী থাকেন, অফিস মতিঝিলে। তবে ভাষা দিবস উপলক্ষে অফিস দ্রুত ছুটি হয়ে যায়, একটি কাজে পল্টনে এসেছিলেন। বায়তুল মোকাররম মসজিদে আসরের নামাজ থেকে বের হওয়ার সময় তাকে ইফতারির জন্য বসতে বলা হয়। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, মাঝেমধ্যেই তিনি বায়তুল মোকাররম মসজিদে নামাজ পড়তে আসেন। তবে বায়তুল মোকাররমে এবারই প্রথম তিনি ইফতার করছেন। দেখা যায়, বড় একটি প্লেট ঘিরে পাঁচ-ছয়জন গোলাকার হয়ে বসে আজানের অপেক্ষা করছেন। প্লেটে সাজানো বুট-মুড়ি, আলুর চপ, জিলাপি, খেজুর, কলা ইত্যাদি বাহারি আয়োজন।
একটি বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন আবিদুর রহমান। তিনি জানান, অফিস থেকে কাজ শেষ করে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে আসরের নামাজ পড়ে দেখি এখানে ইফতারির আয়োজন হচ্ছে। এত বড় আয়োজনে বসতে পেরে আমি আনন্দিত। অনেক মানুষ এখানে একসঙ্গে বসে ইফতারি করবে, দোয়া করবে, জানি না আল্লাহর কোন প্রিয় বান্দার উসিলায় আমার দোয়াও কবুল হবে।
আরিফ খান সাদ
সময়ের আলো/২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬