সেই ২০০০ সাল থেকে স্বচ্ছতার সাথে পথচলা...

August 12, 2026 11:14 am

কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৫৪

সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। ২২ বছর বয়সী সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী লুইস সায়েঞ্জ বলেন, তাঁর কাছে ভূমিকম্পের সময়টিকে ‘অনন্তকাল’ মনে হয়েছিল। সকালে বাড়িতে কফি খাওয়ার সময় কম্পন শুরু হলে তাঁর বিড়ালটি খাটের নিচে চলে যায়। এরপর পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কে বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। সরকারি হিসাবে, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে পেরেইরা ও কালি শহরে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে প্রায় ৫ হাজার বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েক ডজন ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে, যার বেশির ভাগই আবাসিক। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালিতে অন্তত ৯৫ জন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সরকারের হিসাবে, সেখানে ৪৫টি স্থাপনা পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধসে পড়েছে।

কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরগুলোতে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে জীবিতদের সন্ধানে রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা।

কালির দক্ষিণাঞ্চলে ধসে পড়া সাততলা ভ্যানেসা ভবনটি পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। উদ্ধারকারীরা হাতুড়ি, বেলচা ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কংক্রিটের পুরু স্তর সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। উদ্ধারকারীদের ধারণা, ভবনটির ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় ২০ জন আটকা পড়েছেন। শত শত স্বেচ্ছাসেবকও উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন। তাঁরা মানবশৃঙ্খল তৈরি করে ধ্বংসস্তূপ থেকে বালতি হাতে হাতে সরিয়ে ট্রাকে তুলে দিচ্ছেন।

মাঝেমধ্যে উদ্ধারকারীরা মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে সবাইকে নীরব থাকার সংকেত দিচ্ছেন। এরপর ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ জীবিত আছেন কি না, তা বোঝার জন্য নিস্তব্ধ হয়ে শোনার চেষ্টা করছেন তাঁরা।

ভ্যানেসা ভবনটি ধসে পাশের একটি ভবনের ওপর পড়ে। ওই ভবনে একটি শিশুযত্নকেন্দ্র ছিল বলে ঘটনাস্থলে থাকা স্বেচ্ছাসেবকেরা জানিয়েছেন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও উদ্ধারকাজের সমন্বয়কারী ৩২ বছর বয়সী ম্যাক্সিমিলিয়ানো হেরেরা জানান, প্রায় ১৭ শিশু ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অনেক উদ্ধারকর্মী ভূমিকম্পের পর থেকে ঘুমাননি। স্বেচ্ছাসেবক ক্রিস্তিয়ান নিভেস বলেন, তাঁরা সারারাত উদ্ধারকাজ চালিয়েছেন এবং এখনো কাজ থামাননি। দেশটির রাজধানী বোগোতা ও দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মেডেলিন থেকেও দমকলকর্মী ও উদ্ধারকারী দল কালিতে এসে যোগ দিয়েছে। সাধারণ মানুষ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও উদ্ধারকাজে সহায়তা করছে। ভ্যানেসা ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরাতে ব্যবহৃত ক্রেন ও খননযন্ত্রসহ ভারী যন্ত্রপাতি বেসরকারি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়েছে।

কিছু বাসিন্দা মূল্যবান জিনিসপত্র উদ্ধারের জন্য ঝুঁকি নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ঢুকছেন। মঙ্গলবার সকালে পরাঘাতের কারণে ভূমিকম্পের সতর্কসংকেত বেজে উঠলে কয়েকজন বাসিন্দা দ্রুত ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁদের অন্তত তিনজনের হাতে ছিল বড় পর্দার টেলিভিশন। ভূমিকম্পের পর কালিতে লুটপাটের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। অপরাধপ্রবণ শহরগুলোর একটি কালি। সরকারি হিসাবে, গত বছর কলম্বিয়ায় সংঘটিত মোট হত্যাকাণ্ডের ৮ শতাংশের বেশি এই শহরে ঘটেছে; নিহতের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬৭।

অপরাধ বাড়ার আশঙ্কায় কালির মেয়র আলেহান্দ্রো এদের সোমবার শহরে সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে। তবে উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসাকর্মী ও জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এর আওতামুক্ত থাকবেন।

শুক্রবার কালিতে শপথ নেওয়া প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলার জন্য এই ভূমিকম্প বড় ধরনের প্রথম পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভূমিকম্পের পর তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং কালি ও চোকো বিভাগের রাজধানী কিবদোর স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে তুলনামূলক দরিদ্র শহর বুয়েনাভেনতুরার বাসিন্দাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, সরকারি সহায়তা তাদের কাছে যথেষ্টভাবে পৌঁছাচ্ছে না। বুয়েনাভেনতুরা থেকে কালিতে আসা ভ্যালেন্সিয়া বলেন, তাঁদের শহর সবসময়ই অবহেলিত।

কেউ কেউ সরকারের উদ্ধার তৎপরতায় সমন্বয়হীনতার অভিযোগও করেছেন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক হেরেরা বলেন, সহায়তার অভাব নয়, বরং সমস্যা হচ্ছে সমন্বয় ও সংগঠনের অভাবে।

তবে এসব অভিযোগের মধ্যেও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রধান লক্ষ্য এখন যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা। সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সায়েঞ্জও হেলমেট ও মুখে মাস্ক পরে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, তবু তাঁরা কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন

১২ আগস্ট, ২০২৬

আরও - আন্তর্জাতিক সংবাদ