-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
বাউফলের কারখানা নদী ভাঙনে নিঃস্ব শত শত পরিবার
পটুয়াখালীর বাউফলের ১ নম্বর কাছিপাড়া ইউনিয়নের মানচিত্রে সিকদার বাড়ি ও আকন বাড়ি জনসংখ্যা, বিপুল ফসলি জমি নিয়ে বৃহত্তর দুটি পরিবার। দুটি পরিবারকেই নামে চেনে ও জানে পুরো উপজেলাবাসী। কিন্তু আগের সেই জৌলুস নেই সিকদার আর আকন পরিবারের। কারখানা নদী খ্যাতিমান এই দুই পরিবারের এই জৌলুস কেড়ে নিয়েছে।
শুধু সিকদার আর আকন নয়, বাহের চর, পশ্চিম কাছিপাড়া, হাজিপুর, গোপালিয়াসহ আশপাশের গ্রামের অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবার বসতবাড়ি, পুকুর, ফসলি জমি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হারিয়ে এখন আশ্রয় নিয়েছে সড়কের পাশে। এ সব গ্রামের তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাকা সড়ক, বাজার এবং একটি দাখিল মাদ্রাসা প্রায় নিশ্চিহ্নের পথে। এলাকায় চলছে নিঃস্ব মানুষের আহাজারি। পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলেও ভাঙন ঠেকাতে পারছে না।
বাউফল উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন। এর মধ্য ১ নম্বর কাছিপাড়া আয়তন, শিক্ষা, ব্যবসা এবং জনসংখ্যায় এগিয়ে আছে। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে কারখানা নদীর পারে অবস্থিত কাছিপাড়া ইউনিয়ন। প্রমত্তা কারখানা নদী ভাঙনের কবলে পরে এ ইউনিয়নটি হারাচ্ছে তার ইতিহাস-ঐতিহ্য।
কথা হয় নদী ভাঙনের শিকার নাসরিন বেগমের (৩৫) সঙ্গে। কপালে চিন্তার ভাঁজ এই গৃহবধূর। তিন ছেলে নিয়ে সংসার তাঁর। বাপের বাড়ি পাশের উপজেলা বাকেরগঞ্জের লক্ষ্মীপাশা গ্রামে। ২০০৭ সালে বিয়ে হয় কাছিপাড়া সিকদার বাড়ির ইব্রাহিম সিকদারের সঙ্গে। বাবা নামকরা বাড়িতে বিয়ে দিয়েছিল। শ্বশুরবাড়িতে গোয়াল ভরা গরু, মাঠভরা ধান, দালান ঘর, পুকুর ভরা মাছ, বাড়ির পুকুরে পাকা ঘাট। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ‘এই তো দুই বছর আগেও দৃশ্যমান ছিল এলাকার সম্ভ্রান্ত সিকদার বাড়ি। আজ আমি স্বামী-সন্তান নিয়ে ফসলি জমিতে ঘর করে আছি। কারখানা নদী মোর শ্বশুরবাড়ির অস্তিত্ব গিলে খেয়েছে। মোর শ্বশুরবাড়ির এক-দেড়শ লোক ছিল। আজ আমরা ছিন্ন-বিছিন্ন পরিবার।’
বাহের চরের নিত্য গোপাল (৭৮) বসবাস করছেন সড়কের পাশে টিনের ছাউনি দেওয়া দোচালা ঘরে। ছোট চায়ের দোকানেই চলে স্বামী-স্ত্রীর সংসার। বাড়িঘর, ফসলি জমি সব হারিয়ে আজ নিঃস্ব। তাঁর ছেলে সন্তান নেই। তিনটি মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সংসার চলছে মেয়েদের সাহায্যে। নিত্য গোপাল জানান, তাঁর বাবার পাওয়া ছয় একর জমি ভেঙে গড়ে উঠেছে বড় চর। ওই চরে এখন মাথা গোঁজার জমিও নেই তাঁর। চরটি আগে আওয়ামী লীগের লোকজন খেয়েছে। এখন জামায়াত-বিএনপির দখলে। বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এমনি অভিযোগ অনুকূল, বাসুদেবসহ নদী ভাঙনের শিকার অর্ধশত নিঃস্ব পরিবারের।
উপজেলার বাহের চর থেকে গোপালিয়াবাঘা পর্যন্ত প্রায় দশ কিলোমিটারজুড়ে কারখানা নদীর ভাঙন চলছে। ভাঙন রোধে শিগগিরই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হলে বাহের চর বাজারটিও এক দিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। নদী ভাঙনের কারণে চর রঘুনদ্দীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হিস্যাজাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং গোপালিয়া বাঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী দিন দিন কমছে। নদী থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের বিদ্যালয়ের এখন ১০০-১৫০ মিটার কাছে ভাঙন চলছে। দ্রুত বাঁধ না দিলে এসব বিদ্যালয়গুলো নদীতে বিলীন হবে।
কাছিপাড়া ইউপি সদস্য ইয়াকুব জানান, বর্ষা মৌসুমে পাউবো জিও ব্যাগ ফেললেও ভাটার সময়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। দিন দিন কারখানা নদী ফসলি জমি, বাড়িঘর গিলে খাচ্ছে। ভাঙন রোধে দ্রুত টেকসই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ বলেন, কারখানা নদীর ভাঙনের তীব্রতায় কাছিপাড়া, কনকদিয়া ইউনিয়নের মানচিত্র ছোট হয়ে আসছে। উপজেলার মাসিক উন্নয়ন সভায় এসব ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা ভাঙনের তথ্য প্রকাশ করে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন। পরিদর্শনে ভাঙনের ভয়াবহতার চিত্র ফুটে উঠেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জরুরিভাবে তীর রক্ষার কথা জানাব।
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমরান হোসেন সমকালকে বলেন, কারখানা নদীসহ পায়রা নদীর ভাঙন রোধকল্পে একটি সমীক্ষা কাজ চলমান আছে। সমীক্ষা প্রতিবেদন পেলে স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয়ে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রেরণ করা হবে।
জিতেন্দ্র নাথ রায়, বাউফল (পটুয়াখালী)
সমকাল
০২ নভেম্বর ২০২৬