-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
বান্দরবানের টানেল ভাঙাচোরা, অন্ধকারে মৃত্যুফাঁদ
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে নির্মিত বান্দরবানের বাসস্ট্যান্ড থেকে হাফেজঘোনা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল যাওয়ার পথে ৫০০ ফুট দৈর্ঘ্যের টানেলটি নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই ভাঙাচোরা ও অযত্নে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। দেয়ালে ফাটল, ভেতরে পানি চুঁইয়ে পড়া, ছোট-বড় গর্ত, কাদামাটি ও আলোর ব্যবস্থা না থাকায় টানেলটি এখন পথচারী ও গাড়িচালকদের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে।
সরজমিনের গিয়ে দেখা যায়, টানেলে প্রবেশমুখে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, ভেতরে বাতি না থাকায় দিনদুপুরেও ভুতুড়ে অন্ধকার। বৃষ্টির সময় ফাটল দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে রাস্তাজুড়ে জমে থাকে। গাড়ি চলাচলের কারণে রাস্তায় সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গর্ত। অন্যদিকে পাহাড় থেকে মাটি ধসে একপাশে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। পথচারী ও স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের কাদামাটিতে ভিজে বিপদসংকুল পথ পার হতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, টানেলটি উদ্বোধনের দুই বছর না যেতেই দুই পাশে পাহাড় ধসে মাটি ভরাট হয়ে যায়। অপরিকল্পিত ও নিম্নমানের কাজের কারণে টানেলের দেয়ালে ফাটল ধরে, সেই ফাটল দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছে বৃষ্টির পানি। ফলে রাস্তাজুড়ে পানি জমে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় গর্ত, আর এতে ওই রুটে চলাচলকারীরা প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
তারা অভিযোগ করে আরও বলেন, এ যেন সরকারের অর্থ লুটপাটের এক ঘোর উদাহরণ। স্থানীয়দের দাবি, এই পুকুরচুরি ধরনের দুর্নীতির সঠিক তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে (২০১৮-২০২৩ অর্থবছরে) টানেলটি নির্মিত হয়। কাজ শুরু হয় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে, শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের জুনে। তবে দুই দফা বরাদ্দের পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে কাজ শেষ হয়। এম এম ট্রেডার্স লাইসেন্স নামে প্রতিষ্ঠান কাজটি সম্পন্ন করে রাজু বড়ুয়া নামে ঠিকাদার। টানেলটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং, ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর।
ওই রুটের পথচারী ইসলামপুর ৯নং ওয়ার্ডের মোহাম্মদ রেজা বলেন, টানেল দিয়ে যাতায়াতে এখন ভোগান্তি ছাড়া কিছু নেই। ভেতরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব, লাইট না থাকায় মানুষ ভয়ে চলাচল করছে।
আরেক পথচারী মোহাম্মদ সবুজ বলেন, টানেলের ভেতরে কাদামাটি জমে থাকে, আর দীর্ঘদিন ধরে লাইট না থাকায় আশপাশের সাঙ্গু বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। যেখানে আগে ২ মিনিটে যাওয়া যেত, এখন বাধ্য হয়ে অন্য রুট দিয়ে ১৫-২০ মিনিট ঘুরে যেতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এ দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ চায়।
রাজশাহী থেকে ঘুরতে আসা করিম মোল্লা বলেন, আমরা দূরদূরান্ত থেকে পাহাড় দেখতে এসেছি। দুই পাহাড়ের মাঝখানে নির্মিত এই টানেল দেখতে সুন্দর লাগলেও ভেতরে লাইট না থাকায় পুরো অন্ধকার। বান্দরবানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।
টমটম চালক জিশু দাশ ও জিপ চালক মাইকেল বম বলেন, এই টানেল দিয়ে গাড়ি চালানো এখন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। রাস্তার মাটি একপাশ দিয়ে ধসে পড়ে স্তূপ তৈরি হয়েছে, ওয়ালে ফাটল দিয়ে বৃষ্টির পানি ঝর্ণার মতো পড়ছে, ভেতরে রাস্তাগুলো বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। জনসাধারণের সুবিধার জন্য করা হলেও টানেলটি এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বিন ইয়াছির আরাফাত জানান, এটি মূলত সংযোগ সড়ক হলেও অনেকের কাছে টানেল হিসেবে পরিচিত। লোকে কাছে সেটাই পরিচিতি পায়। টানেলের কানেকশনে আরসিসি ঢালাইয়ে যে জয়েন্টগুলো আছে সেখান থেকে পানি পড়ছে। সেটিকে অনেকে না বুঝে টানেল ফেটে পানি পড়ছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। বৃষ্টিতে মাটি ধসে ভরাট হয়ে যায়, জিও ব্যাগ ব্যবহার করলেও সেগুলো চুরি হয়েছে। উদ্বোধনের সময়ের লাইট ও অন্যান্য সামগ্রীও চুরি হয়ে যায়। বৃষ্টির শেষ হলে টানেলটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি জানান, প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ১১ কোটি টাকা (২০১৮-২০২৩ অর্থবছরে)। কাজ শেষ হয় পাঁচ বছর আগে, উদ্বোধন করা হয় দুই বছর আগে। বর্তমানে এটি বান্দরবান পৌরসভার কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। টোল আদায় নিয়ে উন্নয়ন বোর্ড ও পৌরসভার মধ্যে ভাগাভাগির আলোচনা চলছে।
সময়ের আলো/২৯ আগস্ট ২০২৫