-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
নবীজি (সা.)-এর বিশেষ তিন অসিয়ত
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন উম্মতের সবচেয়ে বেশি কল্যাণকামী ও হিতাকাক্সক্ষী। এ জন্য তিনি দুনিয়া ও আখেরাতে যেসব উম্মতের জন্য কল্যাণকর, এমন সব বিষয়ের প্রতি উম্মতকে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। প্রয়োজন অনুপাতে কখনো করেছেন নসিহত কিংবা অসিয়তও। এমনই তিনটি অসিয়তের কথা বর্ণিত হয়েছে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল তিনটি অসিয়ত করেছেন, যা আমৃত্যু আমি পরিত্যাগ করব না- এক. প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখা। দুই. চাশতের নামাজ আদায় করা। তিন. ঘুমানোর আগে বিতর নামাজ আদায় করা। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৭৮)
প্রতি মাসে রোজা : প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখার বিভিন্ন ফজিলত ও হেকমত রয়েছে। এই তিনটি রোজা ‘আইয়ামে বিজ’ তথা প্রতি চান্দ্রমাসের তেরো, চৌদ্দ ও পনেরো তারিখে রাখা সর্বোত্তম। হজরত কুদামা ইবনে মিলহান কায়সি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের আইয়ামে বিজ, অর্থাৎ চান্দ্রমাসের তেরো, চৌদ্দ ও পনেরো তারিখে রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৪৪৯)। এ রোজাগুলোর কিছু ফজিলত ও হেকমত নিম্নরূপ- এক. এটি হৃদয়ের কলুষতা দূর করে। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মাসের তিন দিন রোজা রাখা অন্তরের ক্রোধ (ঘৃণা ও হিংসা) দূর করে’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২৩৮৫)। দুই. প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখলে পুরো মাস রোজা রাখার সমান হয়ে যায়, কেননা একটি নেকির প্রতিদান দশগুণ। এভাবে প্রতি মাসে তিনটি করে রোজা রাখলে সারা বছর রোজা রাখার সমপরিমাণ নেকি পাওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে একটি সৎকর্ম করবে, সে তার দশগুণ (প্রতিদান) পাবে’ (সুরা আনআম, আয়াত : ১৬০)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখা সারা বছর রোজা ও ইবাদত পালনের সমতুল্য’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৩৬৫২)। তিন. রোজা কামনা-বাসনাকে দমন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক হাদিসে বলেন, ‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিয়ে করে, কেননা তা দৃষ্টিকে আরও সংযত করে এবং লজ্জাস্থানকে অধিক সংরক্ষণ করে। আর যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে না তার জন্য রোজা রাখা উত্তম। কেননা রোজা তার জন্য কামনা-বাসনা কমানোর মাধ্যম’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৬৬)। চার. কিছু চিকিৎসক বলেছেন, মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে দেহে আর্দ্রতা (ভেজা ভাব) সৃষ্টি হয়, ফলে দেহে অবাঞ্ছিত বর্জ্য জমে। রোজা এসব বর্জ্য বা তার কিছু অংশ দূর করে দেয়।
চাশতের নামাজ : এটি এমন একটি ইবাদত, যা রাসুলুল্লাহ (সা.) সূর্য উঠার পর দিনের আলো প্রখর হলে আদায় করার জন্য সুন্নত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এর অনেক ফজিলতের কথা হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে। হজরত মুয়াজ ইবনে আনাস জুহানি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ফজরের নামাজের পর ভালো কাজে লিপ্ত থেকে সূর্য একটু ওপরে উঠার পর দুই রাকাত নামাজ আদায় করে, তবে তার সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। যদিও তা সমুদ্রের ফেনার চেয়েও অধিক হয়’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১২৮৭)। অন্য হাদিসে হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বারো রাকাত চাশতের নামাজ আদায় করবে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাতে একটি স্বর্ণের প্রাসাদ নির্মাণ করবেন।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৪৭৩)
বিতর নামাজ : এশার নামাজের পর এক সালামে তিন রাকাত নামাজ পড়াকে বিতর বলে। এশার নামাজের পর থেকে ফজরের আগপর্যন্ত তার সময় বিদ্যমান থাকে। ফিকহে হানাফির গ্রহণযোগ্য মতানুসারে এ নামাজটি ওয়াজিব। হাদিস শরিফে এ নামাজের বহুবিধ ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। হজরত খারিজা ইবনে হুজাফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন আমাদের কাছে এসে বললেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য একটি নামাজ বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। লাল বর্ণের উট থেকেও তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। এই নামাজটি হলো বিতর। এশার নামাজ এবং সুবহে সাদিকের মধ্যবর্তী সময়টিকে আল্লাহ তায়ালা এ নামাজের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৪৫২)।
এ ছাড়া এ নামাজ আল্লাহ তায়ালার কাছে পছন্দনীয় বলে হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৪৫৩)। যাদের শেষ রাতে নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস আছে, তাদের জন্য শেষ রাতে বিতর পড়া উত্তম। অন্যথায় ঘুমানোর আগেই তা আদায় করে নিতে হবে।
খেয়াল রাখতে হবে, যেন কোনোভাবেই নামাজটি ছুটে না যায়। হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার আশঙ্কা থাকে যে, সে শেষ রাতে উঠতে পারবে না, সে যেন প্রথম রাতেই (ঘুমানোর আগে) বিতর আদায় করে নেয়। আর যে ব্যক্তি শেষ রাতে উঠতে পারবে বলে আশা রাখে, সে যেন রাতের শেষভাগে (সুবহে সাদিকের আগে) বিতর আদায় করে। কেননা শেষ রাতের নামাজে ফেরেশতারা উপস্থিত হন এবং এটাই উত্তম’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭৫৫)। আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই অসিয়তগুলোর ওপর সবাইকে আমল করার তওফিক দান করুন।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ
লেখক : মুহাদ্দিস ও প্রাবন্ধিক
সময়ের আলো/জেডআই
১৭ মে, ২০২৬