-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
প্রধান উপদেষ্টার সফরকে সরকারি ঘোষণা করেছে যুক্তরাজ্য
এটা একটি সরকারি সফর। সরকারি সফর আমরা আমাদের পক্ষ থেকে বলছি না, যেখানে আমাদের প্রধান উপদেষ্টা যাচ্ছেন তাদের (যুক্তরাজ্য) পক্ষ থেকেই এটিকে সরকারি সফর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। যেখানে সরকারি সফর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই সফর ব্যক্তিগত বিষয় হিসাবে কিভাবে আসে তা আমার জানা নাই।
বুধবার (৪ জুন) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আসন্ন যুক্তরাজ্য সফর উপলক্ষ্যে দৈনিক সময়ের আলোর এই প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব রুহুল রুহুল আলম সিদ্দিকী এমন মন্তব্য করেন।
দৈনিক সময়ের আলোর এই প্রতিবেদকের প্রশ্নটি ছিল, ড. ইউনূসের আসন্ন যুক্তরাজ্য সফর নিয়ে মিডিয়াসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনা করে বলা হচ্ছে যে ব্যক্তিগত সম্মাননা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রধান উপদেষ্টা যুক্তরাজ্য সফরে যাচ্ছেন, যেটা সরকারি বলা হচ্ছে। এই প্রশ্নের জবাবে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব ওপরের মন্তব্য করেন। এই প্রতিবেদক আরেকটি প্রশ্ন করেন যে আসন্ন সফরে যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ ব্যক্তির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক অনুষ্ঠান হবে। বাংলাদেশে এই মুহুর্তে বিগত সময়ের অর্থ-সম্পদ পাচারকারিদের নিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। ওইসব পাচারকারিরা বাংলাদেশ থেকে অর্থ-সম্পদ পাচার করে যুক্তরাজ্যে আনন্দ করছে, যা ঢাকায় বসে একাধিক সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। এইসব অর্থ-সম্পদ পাচারকারিদের নিয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে কোনো আলাপ হবে কিনা?
আরও পড়ুন: ২০ টাকা নোটের নকশা বাতিলের দাবি
জবাবে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব রুহুল রুহুল আলম সিদ্দিকী বুধবার বলেন, যুক্তরাজ্য বা উন্নত দেশগুলো মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং অন্যান্য বিষয়গুলো খুবই শক্তিশালী। আমরা এখান থেকে বলতে পারি যে ওই লোকগুলো এখান থেকে গিয়ে ওখানে আছে। কিন্তু যতক্ষণ তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা আদালত থেকে কোনো অর্ডার, সমন ইস্যু না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা ওদের (যুক্তরাজ্য) কাছে কিছুই বলতে পারব না। আমরা কী বলব? যতক্ষণ পর্যন্ত আদলত বা আইনি এনটিটি থেকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো সমন বা নির্দেশ না আসে ততক্ষণ পর্যন্ত কিছু বলা যায় না। আদালত থেকে নির্দেশ না আসলে আমরা কাউকে ফেরত চাইতে বা কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ অন্য দেশের কাছে উপস্থাপন করতে পারব না।
ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব রুহুল রুহুল আলম সিদ্দিকী বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামী ১০ থেকে ১৩ জুন যুক্তরাজ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক সরকারি সফরে যাচ্ছেন। তিনি আগামী ৯ জুন লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন এবং সফর শেষে আগামী ১৪ জুন ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করবেন। যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম একটি দেশ। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার এবং বিনিয়োগকারী দেশ। যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক খাতে বাংলাদেশকে নিয়মিতভাবে সহায়তা করে যাচ্ছে। এসব বিষয়াদি বিবেচনায় এই সফরটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে বিদ্যমান চমৎকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও ফলপ্রসূ করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে আশা করছি।
তিনি বলেন, মানুষ, প্রকৃতি ও পরিবেশের মধ্যে সঙ্গতিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিতকরণ, সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন এবং একটি শান্তিপূর্ণ, সৌহার্দ্যময় ও টেকসই পৃথিবী বিনির্মাণের চলমান প্রচেষ্টায় অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লস এ বছরের সম্মানজনক ‘কিংস চার্লস ৩ হারমনি এর জন্য প্রধান উপদেষ্টাকে মনোনীত করেছেন। আগামী ১২ জুন লন্ডনের সেন্ট জেমস’স প্যালেসে আয়োজিতব্য এক অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছ থেকে এই পুরস্কার গ্রহণ করবেন। এটি কেবল প্রধান উপদেষ্টার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের জন্যও এক অসামান্য মর্যাদা ও গৌরবের অনন্য স্বীকৃতি। এই পুরস্কার বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আরও দৃপ্ত ও উজ্জ্বল করবে।
কয়েকটি কারণে সফরটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত সেচিব বলেন, প্রথমত, বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা প্রথমবারের মতো ইউরোপের কোন দেশে দ্বিপাক্ষিক সফরে যাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাজ্য একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেয়। এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে চলমান সংস্কার কার্যক্রম, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অঙ্গীকারের বিষয়টি তুলে ধরা সম্ভব হবে। এবং সর্বোপরি একজন নোবেল বিজয়ী ও বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তি হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার বিশ্বজুড়ে একটি স্বতন্ত্র ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে। তার মতো একজন ব্যক্তিত্বের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে যুক্তরাজ্য সফর বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সমুজ্জ্বল ও সুসংহত করবে।
তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যুক্তরাজ্যের রাজার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, রাজা চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি একটি সম্মানজনক কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। সফরকালে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন বিষয়ক সেক্রেটারি অফ স্টেট জনাব ডেভিড ল্যামি, কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতারা ও থিংক ট্যাঙ্কের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে পারেন।
আরও পড়ুন: ড. ইউনূসের যুক্তরাজ্য সফরে প্রাধান্য পাবে পাচারকৃত অর্থ ফেরত
ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাজ্য বরাবরই আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন দিয়ে আসছে। এই সফরে প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এবং এই মানবিক সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে আরও জোরালো সমর্থন ও সহায়তা চাইবেন। দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টা আগামী ১১ জুন লন্ডনের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান চ্যাটম হাউসে একটি বিশেষ আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন। এই আলোচনায় তিনি বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে তার অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবেন। এছাড়া দ্য কিংস ফাউন্ডেশন তার ৩৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আগামী ১১ জুন সন্ধ্যায় একটি বিশেষ নৈশভোজের আয়োজন করেছে। প্রধান উপদেষ্টা এই নৈশভোজেও যোগ দেবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।
সাংবাদিকরা জানতে চান যে আসন্ন বৈঠকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে প্রদানর উপদেষ্টার বৈঠক হবে কিনা? তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রে কী স্ট্যাটাসে আছেন? জবাবে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আমার কাছে এই বিষয়ে কোনো তথ্য নাই। এই সফরে বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সঙ্গে লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টার কোনো ইভেন্ট আছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, হচ্ছে না। এই সফরে কোনো সমাঝোতা স্মারক বা চুক্তি হবে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা ইন্টারেস্টিং। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ম্যাচিউরড হয়েছে। যোগাযোগ খুব নিবিড়। এই সফরে কোনো সমাঝোতা বা চুক্তি নাই।
সময়ের আলো ডেস্ক/৪ জুন, ২০২৫