সেই ২০০০ সাল থেকে স্বচ্ছতার সাথে পথচলা...

May 16, 2026 4:32 am

দুর্বিষহ স্মৃতির মধ্যেই কাল খুলছে মাইলস্টোন

রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনার ১৩ দিন পেরিয়ে গেলও এখনও ভয়ে-আতঙ্কে শিউরে উঠছে শিক্ষার্থীরা। তাদের সামনে ভাসছে সেই দুর্বিষহ স্মৃতি। কাছের বন্ধুদের চিরদিনের জন্য হারিয়ে শিক্ষার্থীদের অনেকে বাকহীন।

অসুস্থতা আর অস্বাভাবিক আচরণে দিন কাটাচ্ছে অনেকে। যদিও শিক্ষার্থীদের এই ট্রমা থেকে বেরিয়ে আনতে এরই মধ্যে সেখানে বিশেষ কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

শনিবার (২ আগস্ট) সকালে উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের আত্মার মাগফিরাত ও আহত ব্যক্তিদের দ্রুত আরোগ্য লাভের কামনায় শোক ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কর্তৃপক্ষ। যদিও স্কুলের কার্যক্রম এখন শুরু হয়নি।

তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমান দুর্ঘটনার পর রোববার (৩ আগস্ট) থেকে ক্লাস নাইন থেকে একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হবে। বাকি ক্লাসগুলো বিষয়ে আলোচনা চলছে। আর আগামী ৫ আগস্ট স্কুলের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু হতে পারে। সেটি নিয়ে আলোচনা চলছে। কারণ অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখন ট্রমার মধ্যে আছে।

গত ২১ জুলাই দুপুরে বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবনের মুখে বিধ্বস্ত হয়। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই সামরিক বিমান দুর্ঘটনা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, বিমান দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই শিশু এবং মাইলস্টোন ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী।

শনিবার বিকালে সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এখনো ৪১ জন দগ্ধ রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ২৯ জন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ১১ জন এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে একজন রোগী ভর্তি রয়েছেন।

এদিকে শনিবার উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের আত্মার মাগফিরাত ও আহত ব্যক্তিদের দ্রুত আরোগ্য লাভের কামনায় শোক ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

সেখানে কথা বলেন মাইলস্টোন স্কুলের দিয়াবাড়ী ক্যাম্পাসের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন (অব.) জাহাঙ্গীর খান। তিনি বলেন, ‘পৌনে দুই বছর ধরে আমি এই কলেজের দায়িত্বে আছি। কোনো দিন একটার সময়, ছুটির সময় আমি বাইরে যাই না। আমি বারান্দায় দাঁড়াই, হাঁটাহাঁটি করি, শিক্ষকদের, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন দেখি, স্টুডেন্টদের দেখি। ওই দিন প্রধান শিক্ষিকা (দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসের বাংলা ভার্সনের ) ডেকে নিয়ে গেলেন, ১টার সময় দুজন নতুন শিক্ষকের সাক্ষাৎকার নেবেন। বেলা ১টা ৪ মিনিটের দিকে বের হয়ে সেখানে গেলাম। আর ১টা ১২ থেকে ১৩ মিনিটের মাঝামাঝি সময়ে দুর্ঘটনা ঘটল। না হলে হয়তো আমিও লাশ হতে যেতাম।’

অধ্যক্ষ বলেন, যে বাচ্চারা আমাদের ছেড়ে গেছে, তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। এই দুর্ঘটনা যদি ১টা ৪-৫ মিনিটের দিকেও হতো, তাহলে আমরা যে কত কিছু হারাতাম, আরও কতজন মা-বাবা যে সন্তানহারা হতেন; কারণ, স্কুল ছুটির পর প্রায় ১০ মিনিট লাগে বাচ্চাদের বের হতে।

এ সময় অধ্যক্ষ উদ্ধারকাজে শিক্ষক-কর্মচারীদের ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘আপনাদের কষ্ট, আপনাদের বেদনা সবকিছুর প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাই। যদি কারও মনে এতটুকুও মনে হয় অবহেলাজনিত কারণে, এর দায় একমাত্র আমার আর কারও নয়। আপনারা যেকোনো বিচার করতে পারেন।’

অনুষ্ঠানে মাইলস্টোন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী জারিফ হাসানের বাবাকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সেদিন নাকি ও স্কুলে আসতে চায়নি। ওর মা বলল।’

তিনি আরও বলেন, ছেলেটা আমার খুব চটপটে ছিল। সে খুব ফ্রেন্ডলি ছিল।
স্কুলের বাংলা মাধ্যমের সহকারী শিক্ষক মাসুকা বেগমও যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় নিহত হয়েছেন। তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। সহকর্মীরা বলেছেন, তিনি চাইলে কক্ষ থেকে দৌড়ে বের হয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু বাচ্চাদের রেখে রুম থেকে বের হননি।

মাসুকার দুলাভাই খলিলুর রহমান বলেন, আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা শুনতে পাই। সঙ্গে সঙ্গে মাসুকার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। কিন্তু পাচ্ছিলাম না। ঢাকায় স্কুলে এসেও তার খোঁজ নেওয়া হয়। তারপরও পাচ্ছিলাম না। পরে হাসপাতালে তার খোঁজ পাওয়া যায়।

শোক ও দোয়া অনুষ্ঠানের শুরুতে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে বক্তব্য দেন প্রধান শিক্ষিকা খাদিজা আক্তার। শেষে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে দোয়া করা হয়। এ সময় মাইলস্টোনের নির্বাহী অধ্যক্ষ রিফাত নবী আলম উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কলেজের ইংরেজি শিক্ষক নুসরাত আলম।

এদিকে, শিক্ষার্থীদের ট্রমা থেকে বেরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে স্কুল প্রাঙ্গলে বিশেষ কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চলছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী দ্বারা পরিচালিত সাত দিনব্যাপী অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্প। ওই ক্যাম্পে শিক্ষার্থীদের সেবা দিতে চিকিৎসকদের পাশাপাশি মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন। বিমানবাহিনী ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং করতে বুথ বসিয়েছে কিছু বেসরকারি সংস্থাও।

ওই ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, কাউন্সেলিং সেন্টারের সামনে শিক্ষার্থীরা তাদের অভিভাবক ও স্বজনদের নিয়ে অপেক্ষা করছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের একেক জনকে ঘণ্টাব্যাপী কাউন্সেলিং করতে দেখা গেছে।

দুর্ঘটনার পর থেকে মানসিক অস্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছে ওই স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থী তামজিদুল ইসলাম মাসরুর (১০)। তার মা নিলুফা আক্তার বলেন, ঘটনার দিন আগেই স্কুল ছুটি হয়ে যায়। আমি যখন ছেলেকে নিয়ে স্কুল গেট থেকে বের হলাম, তখনই বিমানটা পড়লো। বের হওয়ার কারণে আমরা বেঁচে গেছি। মাসরুর তার বন্ধু আরিয়ানকে হারিয়েছে। এসব ভেবে সে এখন ভয় পাই। ফোন হাতে নিলেই সে অস্বস্তি বোধ করে। তাই আজ তাকে কাউন্সেলিং সেন্টারে নিয়ে আসলাম। তাকে কাউন্সেলিং করা হয়েছে। ধীরে ধীরে যদি তার ট্রমা কাটে, এখন সেটাই ভাবছি।

সময়ের আলো/২ আগস্ট ২০২৫

আরও - জাতীয় সংবাদ