-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা পেয়ে নেপাল নিয়ে নমনীয় মোদি
ভারতের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের সমালোচনা হলো প্রতিবেশী দেশগুলোতে নির্দিষ্ট দলের প্রতি একপেশে নির্ভরশীলতা। বাংলাদেশের পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে ঘিরে দিল্লির অতিরিক্ত আস্থা আজ বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে ভারতে গা-ঢাকা দেওয়া হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নানা টানাপড়েন চলছে। নেপালেও পুরোনো দলগুলোর বয়স্ক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করাই ছিল ভারতের নীতি। কিন্তু ঢাকার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার নয়াদিল্লি দ্রুত পথ বদলাচ্ছে। নেপালে যুবসমাজের উত্থান ও রাজনৈতিক পালাবদল স্বীকার করে মোদি আগেভাগেই নমনীয় ভঙ্গিতে হাত বাড়ালেন। মণিপুরের জনসভা থেকে তিনি নেপালের নতুন নারী প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি সরাসরি তরুণ প্রজন্মকে বার্তা দিলেন যে, ভারত এখন নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে তরুণদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে প্রস্তুত।
মণিপুরে দেওয়া বক্তব্যে মোদি নেপালের সদ্য নিযুক্ত অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কিকে অভিনন্দন জানালেন এবং দেশটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য তার প্রতি শুভেচ্ছা জানালেন। সেই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মোদি নেপালের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কার্কির নিয়োগকে নারী ক্ষমতায়নের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত বলে অভিহিত করেন। পাশাপাশি তিনি আশা প্রকাশ করেন, কার্কি নেপালে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করবেন। এ ব্যাপারে হিন্দুস্তান টাইমসের এক নিবন্ধে কাঠমান্ডুর ইনস্টিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট স্ট্যাডিজের সিনিয়র ফেলো আখিলেশ উপাধ্যায় বলেছেন, নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৃহৎ ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভারতের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য প্রিন্টের এক মন্তব্য কলামে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কমেন্টেটর রিশি গুপ্ত লিখেছেন, বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের পর ভারত ও নেপালের অভিন্ন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে মোদির এই বার্তা ছিল গঠনমূলক। বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ নেপালে সম্প্রতি যুবসমাজ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ‘ওল্ডিগার্কি’ (বৃদ্ধ নেতৃত্বের শাসন) বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। তা হলে প্রশ্ন ওঠে, যখন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মোদির এক্স পোস্ট থেকেই বার্তা দেওয়া হয়ে গিয়েছিল, তখন কেন তিনি মণিপুরের জনসভায় নেপাল প্রসঙ্গে কথা বললেন?
মোদির এই বক্তব্য মূলত নেপালের জেনারেশন জেডের উদ্দেশে। যারা পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হয়ে ‘ওল্ডিগার্কি’র অবসান ঘটিয়েছে এবং এখন অন্তর্বর্তী সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নয়া দিল্লি বুঝে গেছে যে, এবার নেপাল নীতিতে পরিবর্তনের সময় এসেছে। এতদিন ভারত প্রধানত নেপালের ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর বয়স্ক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। বিশ্লেষক ও লেখক কানক মণি দীক্ষিত সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুতে এক লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, ভারত ও নেপালের সম্পর্ক ‘বড় ভাই-ছোট ভাই’ ধাঁচ থেকে এবার ‘ভাই’ ধাঁচে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ ভারত যেমন অতীতে প্রভাবের মাধ্যমে নেপালকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে, এখন তার পরিবর্তে বন্ধুত্বপূর্ণ, সমানভাবে কথা বলার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বাংলাদেশ থেকে নেওয়া শিক্ষা : ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় সমালোচনা ছিল প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সমানভাবে সম্পর্ক না রাখা। বরং নির্দিষ্ট প্রিয় দলকে ঘিরেই সম্পর্ক সীমাবদ্ধ রাখা হতো। যেমন বাংলাদেশে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ অথবা নেপালে শের বাহাদুর দেউবার নেপালি কংগ্রেস। সংকট বা রাজনৈতিক পালাবদলের সময় নতুন নেতৃত্বকে যারা সবসময় বন্ধুসুলভ হতো না তাদেরকে মেনে নেওয়া ভারতের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াত। এবার সেই ভুল শুধরে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে ভারত। মোদির বক্তব্যে তিনি নেপালে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষাকারীদের প্রশংসা করেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, সেপ্টেম্বরে ৮ ও ৯ তারিখে বিক্ষোভে পুড়িয়ে দেওয়া ভবনগুলো পরিষ্কার ও সাদা করার কাজে তরুণরাই এগিয়ে এসেছে। এভাবে ভারত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে তারা ইতিমধ্যেই নেপাল নীতিতে নতুন সূচনা করেছে এবং তরুণ নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে প্রস্তুত।
তবে এ সিদ্ধান্ত হুট করে আসেনি। এর পেছনে ছিল সুপরিকল্পিত কৌশল। শুরুতেই বলা যায়, জেন-জি অতীত ইতিহাসের ভার বহন করে না। ফলে তারা নেপালের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে চালিত করতে পারে। যারা সুযোগ, অর্থনৈতিক সুবিধা ও উন্নয়ন এনে দিতে পারবে তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক গভীর করার পক্ষে তারা। এ প্রেক্ষাপটে নেপালের প্রথম পছন্দ হওয়া উচিত ভারত। কারণ নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে দেশটির উন্নয়ন সহযোগী, তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে প্রথম সহায়তাকারী।
কিন্তু নেপালের তরুণ প্রজন্ম ভারতকে দেখেছে ভিন্ন দৃষ্টিতে। ২০১৫ সালের সীমান্ত অবরোধ এবং ২০২০ সালের লিপুলেখ ও কালাপানির সীমান্ত বিরোধের ঘটনা তাদের মনে গেঁথে গেছে। এতদিনের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলো এই অমীমাংসিত ইস্যুগুলোকে কাজে লাগিয়ে ভোটের রাজনীতিতে অতি-জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিয়েছে। তবে এখনকার যুবসমাজ এসব ইস্যুতে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সরব হওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা ঠেকাতে তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। একই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা অন্য দেশগুলোর বিরুদ্ধেও প্রচার চালাতে পারে, যারা অমীমাংসিত সমস্যা সমাধান করতে গড়িমসি করবে। যদিও ভারত-নেপাল সম্পর্কে অনেক অগ্রগতি হয়েছে, সীমান্ত বিরোধসহ কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন এখনও সম্পর্ককে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
চীনের প্রভাব : তবে এই পটপরিবর্তনের সময় নেপালি তরুণদের কাছে ভারতের চেয়ে চীনের প্রস্তাব আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। গত এক দশকে বেইজিং শিক্ষা বৃত্তি ও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে নেপালি যুবসমাজের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ তৈরি করেছে। সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেপালি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। নেপালি তরুণরা মনে করে, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নেপালের উন্নয়নের বড় সুযোগ। চীন এখন অপেক্ষাকৃত নীরব কূটনীতি চালাচ্ছে, তবে যুব নেতৃত্বাধীন নেপাল তাদের স্বাগত জানাবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তা ছাড়া চীন ‘উলফ ওয়ারিয়র’ কূটনীতির মাধ্যমে জনমত অর্জনের কৌশল নিতে পারে। ভৌগোলিকভাবে নেপালকে বেইজিং ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখে। যা তিব্বতে শান্তি-স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এবং ভারতের প্রভাবের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গুরুত্বপূর্ণ।
নেপালে যখন জেন-জি মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করছে, ভারত দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তন মেনে নিয়ে ইতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে। তরুণদের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়ে নয়াদিল্লি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তাদের নেপাল নীতিতে পরিবর্তন আসছে। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হবে যুবসমাজের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা।
সময়ের আলো/জেডআই
তৌহিদুজ্জামান সোহান
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫