সেই ২০০০ সাল থেকে স্বচ্ছতার সাথে পথচলা...

September 29, 2026 3:10 pm

ইরানকে ঠেকাতে মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে টান

যুদ্ধবিরতির সমাপ্তি ঘোষণা করে ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের বিপদ ডেকে আনছে কি না, এমন আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ প্রায় ৫ মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান অস্ত্রের ভান্ডারে টান পড়েছে। বর্তমান হারে ইরানে হামলা চলতে থাকলে অস্ত্রের মজুদ সংকট আরও তীব্র হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদ ইরান যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে ৩ বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে চীন বা উত্তর কোরিয়ার দিক থেকে কোনো ঝুঁকি এলে তা মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে, মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।

থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্পস কর্নেল মার্ক কানসিয়ান বলেছেন, গত পাঁচ দিন ধরে যেভাবে যুদ্ধ চলছে, তা যদি এই হারেই চলতে থাকে, তবে এটি অস্ত্রের মজুদ এতটাই কমিয়ে দেবে যে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ঝুঁকির একটি নতুন ও উচ্চতর স্তর তৈরি হবে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন থিঙ্ক ট্যাঙ্কের পররাষ্ট্র নীতি গবেষণা প্রধান মাইকেল ও’হানলন বলেছেন, ‘অস্ত্রের মজুদ যে আমাদের পছন্দের চেয়ে কম রয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’

ইরান যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায় থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী দূরপাল্লার হামলা এবং শত্রুর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা পেতে হাজার হাজার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। কিন্তু সে তুলনায় নতুন অস্ত্র ভান্ডারে যুক্ত হয়নি। সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ যখন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়; ততদিনে পেন্টাগন তাদের থাড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টরের অন্তত অর্ধেক, প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধেক এবং টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের অন্তত ৩০ শতাংশ ব্যবহার করে ফেলেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পুনরায় মজুদকরণের হার খুবই ধীর। চলতি অর্থবছরের সরবরাহ সূচি অনুযায়ী, পেন্টাগন প্রতি মাসে আনুমানিক ১৫টি নতুন টমাহক এবং ২০টি নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে। ২০২৬ সালে কোনো থাড সরবরাহের পূর্বাভাস নেই। সিএসআইএসের ধারণা, মার্কিন অস্ত্রের মজুদ ইরান যুদ্ধের আগের স্তরে ফিরিয়ে নিতে তিন বছর বা তার বেশি সময় লাগবে।

পেন্টাগনের সাবেক ডেপুটি এবং অ্যাক্টিং কমপ্ট্রোলার, বর্তমানে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এলেন ম্যাককাস্কার জানিয়েছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অস্ত্রের পুনরায় মজুদ করার সময়কাল বছর দিয়ে হিসাব করতে হবে, অধিকাংশের জন্য দুই থেকে পাঁচ বছর।

সংকট শুধু মজুদে নয়, নতুন করে অস্ত্র তৈরিতে অর্থ পেতেও সমস্যায় পড়ছে ট্রাম্প প্রশাসন। অবসরপ্রাপ্ত দুই তারকা জেনারেল জন ফেরারি, যিনি বর্তমানে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিস্থাপনের জন্য কংগ্রেস একটি ডলারও বাড়তি বরাদ্দ দেয়নি।

পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা দফতর প্রতিরক্ষা শিল্প ভিত্তি দ্রুত সম্প্রসারণ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে ট্রাম্প জুনে ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট প্রয়োগ করেন এবং প্রতিরক্ষা দফতর উৎপাদন লাইন সম্প্রসারণের জন্য নির্মাতাদের সঙ্গে চুক্তি করেছে। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদার মধ্যে জার্মানি এবং ইউক্রেনের মতো অন্যান্য দেশগুলোকে অভ্যন্তরীণভাবে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স চুক্তি দেওয়া হলে তা মার্কিন উৎপাদন লাইনের ওপর চাপ কমাতে পারে।

তুরস্কে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে কথা বলার সময় ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের জন্য এই লাইসেন্সের ঘোষণা দেন। মোদ্দা কথা, অস্ত্রের মজুদ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সম্ভাব্য সব উৎস ব্যবহারের চেষ্টা করছে। কিন্তু সমস্যা হলো যত চুক্তিই হোক বা অনুমতি দেওয়া হোক, রাতারাতি অস্ত্র তৈরি সম্ভব নয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সময় লাগে। জাপানে প্যাট্রিয়ট কারখানা তৈরি করতে তিন বছর সময় লেগেছিল। ২০২২ সালে উৎপাদন লাইনের কাজ শুরু করার পরও জার্মানি এখনও একটিও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারেনি।

যুদ্ধবিরতি মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে কিছুটা স্বস্তি এনেছিল। কিন্তু নতুন করে যুদ্ধের তীব্রতা অস্ত্রের মজুদের বিষয়টি আবার আলোচনায় এনেছে। অস্ত্রের মজুদের যে অবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী হুমকির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কতদিন বর্তমান তীব্রতায় হামলায় অব্যাহত রাখতে পারেবে তা নিয়েই শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

১৩ জুলাই, ২০২৬

আরও - আন্তর্জাতিক সংবাদ