-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
যে ৪ উপলব্ধি মানুষকে আল্লাহর কাছাকাছি করে দেয়
মানুষের জীবনের অধিকাংশ অস্থিরতা সৃষ্টি হয় চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে— রিজিকের দুশ্চিন্তা, আল্লাহর হক আদায়ে অবহেলা, মৃত্যুকে ভুলে থাকা এবং আল্লাহর সর্বদর্শী উপস্থিতির অনুভূতির অভাব। ইসলামের প্রাথমিক যুগের প্রখ্যাত তাবেয়ী ইমাম হাসান বসরী (রহ.)-এর কিছু উপদেশ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজে আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার শিক্ষা হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে। এ উপদেশগুলো কুরআন ও সহিহ হাদিসের মৌলিক আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
১. রিজিক নিয়ে অস্থির না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করুন
‘যখন থেকে আমি এটা জানতে পারলাম যে, আমার রিজিক ও জীবিকা আমার জন্য পৃথক করে রাখা হয়েছে, যা কোনো অবস্থাতেই হ্রাস-বৃদ্ধি করা হবে না, তখন থেকে আমি রিজিকের চিন্তা ত্যাগ করেছি।’
রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। মানুষের দায়িত্ব হলো বৈধ উপায়ে চেষ্টা করা এবং ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ইমানকে দুর্বল করে, কিন্তু তাওয়াক্কুল অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয়। কুরআনের দলিল—
وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا
‘পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নয়।’ (সুরা হুদ: ৬)
হাদিসের দলিল—
لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ، لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ، تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا
‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথার্থ ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দিতেন, যেমন তিনি পাখিদের রিজিক দেন। তারা সকালে ক্ষুধার্ত বের হয় এবং সন্ধ্যায় পরিপূর্ণ পেট নিয়ে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি ২৩৪৪)
২. আল্লাহর হক আদায়কে জীবনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিন
‘যখন আমি এটা অবগত হলাম যে, আমার ওপর আল্লাহর হক ও দাবি রয়েছে— যা আমি ছাড়া অন্য কেউ পূরণ করতে পারবে না, তখন থেকে আমি সেই হক আদায়ের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছি।’
মানুষের সম্পদ, পরিবার কিংবা সমাজ তার পরিবর্তে ইবাদত করতে পারবে না। তাই নামাজ, রোজা, জাকাত, আল্লাহর আনুগত্য ও নেক আমল নিজেকেই করতে হবে। কুরআনের দলিল—
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
‘আমি জিন ও মানুষকে শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা আয-যারিয়াত: আয়াত ৫৬)
হাদিসের দলিল—
حَقُّ اللَّهِ عَلَى الْعِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوهُ وَلَا يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا
‘বান্দাদের ওপর আল্লাহর হক হলো, তারা কেবল তারই ইবাদত করবে এবং তার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করবে না।’ (বুখারি ২৮৫৬, মুসলিম ৩০)
৩. মৃত্যুকে স্মরণ করুন এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নিন
‘যখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস হলো যে, মৃত্যুর হাত থেকে কোনো অবস্থাতেই মুক্তি পাওয়া যাবে না, তখন থেকে আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি।’
মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের পাশাপাশি আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের জন্যও প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কুরআনের দলিল—
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ
‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৮৫)
হাদিসের দলিল—
أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ
‘তোমরা আনন্দ-বিলাসের অবসান ঘটায় এমন বিষয়— অর্থাৎ মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ কর।’ (তিরমিজি ২৩০৭, নাসাঈ ১৮২৪)
৪. আল্লাহ সবকিছু দেখছেন— এই অনুভূতি পাপ থেকে দূরে রাখে
‘যখন আমি এটা অবগত হলাম যে, আমার একজন আল্লাহ আছেন, যিনি আমার সমস্ত কাজের খবর রাখেন, তখন থেকে আমি সেই সব কাজ থেকে বিরত রয়েছি, যার জন্য কিয়ামতের দিন তার মহান দরবারে আমাকে লজ্জিত হতে হবে।’
মুমিনের জীবনে ‘ইহসান’-এর চেতনা হলো— সে এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন সে আল্লাহকে দেখছে; আর যদি সে আল্লাহকে না-ও দেখে, তবে বিশ্বাস করবে যে আল্লাহ তাকে অবশ্যই দেখছেন। কুরআনের দলিল—
أَلَمْ يَعْلَمْ بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى
‘সে কি জানে না যে, আল্লাহ সবকিছু দেখেন?’ (সুরা আল-আলাক: আয়াত ১৪)
হাদিসের দলিল—
أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ
‘ইহসান হলো—তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাকে দেখছ। আর যদি তুমি তাকে দেখতে না পাও, তবে (বিশ্বাস করবে যে) তিনি অবশ্যই তোমাকে দেখছেন।’ (বুখারি ৫০, মুসলিম ৯)
জীবনের প্রকৃত সফলতা সম্পদ, পদমর্যাদা বা দুনিয়াবি অর্জনে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মধ্যেই নিহিত। রিজিকের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ভরসা, তার হক যথাযথভাবে আদায়, মৃত্যুর প্রস্তুতি এবং সর্বদা এই বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ আমাদের প্রতিটি কাজ দেখছেন—এই চারটি নীতি একজন মুমিনের জীবনকে আলোকিত করতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
যুগান্তর/ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬