সেই ২০০০ সাল থেকে স্বচ্ছতার সাথে পথচলা...

July 28, 2026 12:57 pm

সময়ের সদ্ব্যবহার মুমিনের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ

মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কী- এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকে অর্থ, সম্পত্তি, জ্ঞান, সুস্বাস্থ্য কিংবা সম্পর্কের কথা বলবেন। এগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ নেয়ামত। কিন্তু এমন একটি সম্পদ আছে, যার ওপর অন্য সব অর্জন নির্ভরশীল; সেটি হলো সময়। অর্থ হারালে আবার উপার্জন করা যায়, সম্পদ নষ্ট হলে পুনরায় গড়ে তোলা যায়, অসুস্থতার পর সুস্থতাও ফিরে আসতে পারে, কিন্তু চলে যাওয়া সময় আর কোনো দিন ফিরে আসে না। তাই সময়ের সঠিক ব্যবহার কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির উপায় নয়, এটি জীবনের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ।

মানুষের জীবন মূলত সময়েরই সমষ্টি। শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য সবই সময়ের বিভিন্ন অধ্যায়। একটি দিন, একটি মাস কিংবা একটি বছর অতিক্রম করা মানে জীবনের একটি অংশ কমে যাওয়া। অথচ আমরা অনেকেই সময়কে এমনভাবে ব্যয় করি, যেন আমাদের হাতে অফুরন্ত জীবন রয়েছে। পরিকল্পনাহীন দিনযাপন, অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা, উদ্দেশ্যহীন বিনোদন, অলসতা, পরনিন্দা, অকারণ বিতর্ক এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারে মানুষের অমূল্য সময় নষ্ট হচ্ছে। একসময় মানুষ ফিরে তাকিয়ে দেখে, তার জীবনের বড় অংশই চলে গেছে, কিন্তু অর্জনের খাতা তেমন সমৃদ্ধ হয়নি।

সময় যে কত মূল্যবান তা বোঝাতে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সময়ের শপথ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে’ (সুরা আসর : ১-৩)। মাত্র তিনটি আয়াতের এই সুরায় মানুষের সফলতা ও ব্যর্থতার মূলনীতি তুলে ধরা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা সময়ের শপথ করে জানিয়ে দিয়েছেন, সময়কে সঠিক পথে ব্যবহার না করলে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। তবে যারা ঈমানের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করে, সৎকাজে সময় ব্যয় করে, সত্যের পক্ষে দাঁড়ায় এবং ধৈর্যধারণ করে তারাই প্রকৃত সফল।

সময়ের অপচয় শুধু পার্থিব ক্ষতি ডেকে আনে না, এটি আখেরাতের জন্যও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর দেওয়া আমানত। মানুষ তার জীবন, যৌবন, জ্ঞান, সম্পদ এবং সময় কোথায় ব্যয় করেছে এসব বিষয়ে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন বান্দার পা সরবে না, যতক্ষণ না তাকে তার জীবন সম্পর্কে জিগ্যেস করা হবে সে তা কোথায় ব্যয় করেছে; তার যৌবন সম্পর্কে জিগ্যেস করা হবে সে তা কোথায় শেষ করেছে।’ (জামে তিরমিজি : ২৪১৬)

একজন মানুষ যদি তার সময়কে নেক আমল, ইবাদত, জ্ঞানচর্চা, পরিবার ও সমাজের কল্যাণে ব্যয় করে, তবে সেটিই তার জন্য সঞ্চয় হয়ে থাকবে। আর যদি সময় গুনাহ, অবহেলা ও অর্থহীন কাজে নষ্ট করে, তবে সেটিই একদিন অনুশোচনার কারণ হবে। মানুষ সাধারণত সুস্থতা ও অবসরকে স্থায়ী মনে করে। সুস্থ থাকা অবস্থায় ভাবে পরে ইবাদত করবে, অবসর থাকা অবস্থায় ভাবে পরে পড়াশোনা করবে, যৌবনে ভাবে বয়স হলে বদলে যাবে। কিন্তু সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। অসুস্থতা, ব্যস্ততা, বার্ধক্য কিংবা মৃত্যু সবই হঠাৎ এসে যেতে পারে। তাই সুযোগ থাকা অবস্থায় কল্যাণকর কাজ সম্পন্ন করে নেওয়াই প্রজ্ঞার পরিচয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তা হচ্ছে সুস্থতা আর অবসর।’ (সহিহ বুখারি : ৬৪১২)

বর্তমান সময়ে সময় নষ্টের অন্যতম বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে প্রযুক্তির অপব্যবহার। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন বিনোদন মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয় অনেক কাজ সহজ করেছে। কিন্তু এর অযথা ব্যবহার মানুষকে মনোযোগহীন, অলস ও দায়িত্ববিমুখ করে তুলছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও দেখা, উদ্দেশ্যহীন স্ক্রল করা, অনলাইন তর্কে জড়িয়ে পড়া কিংবা অপ্রয়োজনীয় খবরের পেছনে সময় ব্যয় করা এসব অভ্যাস ধীরে ধীরে মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। প্রযুক্তি তখনই কল্যাণকর, যখন তা জ্ঞান, দক্ষতা, যোগাযোগ ও সেবার কাজে ব্যবহৃত হয়। অন্যথায় এটি সময় নষ্টের সবচেয়ে বড় ফাঁদে পরিণত হয়।

বিশেষ করে তরুণদের জন্য সময়ের সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। যৌবন হলো শক্তি, সাহস, মেধা ও সম্ভাবনার সময়। এই সময়কে যদি শিক্ষাগ্রহণ, চরিত্র গঠন, দক্ষতা উন্নয়ন, কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান অর্জন এবং সমাজসেবায় ব্যয় করা যায়, তবে একজন তরুণ ব্যক্তি, পরিবার ও দেশের জন্য সম্পদে পরিণত হয়। কিন্তু এই সময় যদি নেশা, অশ্লীলতা, অপরাধ, অলসতা ও অনৈতিক বিনোদনে নষ্ট হয়, তবে তার ক্ষতি কেবল ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটি বিষয়ের আগে গনিমত মনে করো- বার্ধক্যের আগে যৌবনকে, অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে, দারিদ্র্যের আগে সচ্ছলতাকে, ব্যস্ততার আগে অবসরকে এবং মৃত্যুর আগে জীবনকে।’ (মুসতাদরাকে হাকিম : ৭৮৪৬)

সময়ের সঠিক ব্যবহারের জন্য প্রথম প্রয়োজন লক্ষ্য নির্ধারণ। যে মানুষ জানে না সে কোথায় যেতে চায়, তার কাছে সময়ের মূল্যও স্পষ্ট হয় না। জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে দ্বীন ও দুনিয়ার ভারসাম্য বজায় রেখে। এরপর প্রতিদিনের কাজের একটি পরিকল্পনা থাকা জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ কাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। প্রতিদিন কিছু সময় কুরআন তেলাওয়াত, ইবাদত, পড়াশোনা, পরিবার এবং আত্মসমালোচনার জন্য নির্ধারিত রাখা যেতে পারে। দিনের শেষে নিজের কাছে প্রশ্ন করা দরকার আজ আমি কী শিখলাম, কী ভালো কাজ করলাম, কোথায় সময় নষ্ট করলাম এবং আগামীকাল কীভাবে আরও ভালোভাবে সময় ব্যবহার করতে পারি?

সময় ব্যবস্থাপনা শুধু ব্যক্তিগত সফলতার বিষয় নয়; এটি নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধেরও অংশ। একজন ছাত্র সময়মতো পড়াশোনা করলে, একজন কর্মজীবী দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করলে, একজন ব্যবসায়ী সততার সঙ্গে লেনদেন করলে, একজন অভিভাবক সন্তানকে সময় দিলে এবং একজন নাগরিক সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখলে একটি সুস্থ, শৃঙ্খলিত ও উন্নত সমাজ গড়ে ওঠে।

মনে রাখতে হবে, সময়ই জীবন। সময়কে অবহেলা করা মানে নিজের জীবনকে অবহেলা করা। যে ব্যক্তি সময়কে সৎকাজ, জ্ঞান, ইবাদত, পরিবার ও মানবকল্যাণে ব্যয় করে, তার জীবনই হয়ে ওঠে অর্থবহ। আর যে ব্যক্তি সময়কে উদ্দেশ্যহীনতায় নষ্ট করে, সে একদিন অনুশোচনা ছাড়া কিছুই পায় না। অতএব জীবনের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হোক সময়ের সঠিক ব্যবহার। আজকের একটি সঠিক সিদ্ধান্ত, একটি ভালো কাজ, একটি উপকারী শিক্ষা কিংবা একটি নেক আমল আগামী দিনের জীবনকে বদলে দিতে পারে। সময়কে কাজে লাগানোই হোক আমাদের ব্যক্তিগত উন্নতি, সামাজিক কল্যাণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।

মুফতি আশিকুল্লাহ বিন আসাদ
খতিব, মদীনাতুন নূর মসজিদ কমপ্লেক্স, শ্রীপুর, গাজীপুর

সময়ের আলো/আআ
২৮ জুলাই, ২০২৬

আরও - ইসলাম সংবাদ