সেই ২০০০ সাল থেকে স্বচ্ছতার সাথে পথচলা...

October 12, 2026 3:25 pm

‘বাংলা কিউআর’-এ ক্যাশলেস লেনদেনের নতুন দিগন্ত

অবশেষে পকেটে নগদ বা খুচরা টাকা না থাকলেও থমকে যাবে না দৈনন্দিন জীবন। রিকশা ভাড়া, বাসের টিকিট, চায়ের দোকানের বিল কিংবা রাস্তার ধারে সাহায্যপ্রার্থী কে দান—সবই এখন সম্পন্ন করা যাবে স্মার্টফোনে একটি মাত্র কিউআর কোড স্ক্যান করে। ১ নভেম্বর থেকে সারা দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে ‘বাংলা কিউআর’ পেমেন্ট ব্যবস্থার চতুর্থ ধাপ (পিটুপি)। এর মাধ্যমে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র লেনদেনকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজ করে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

কাগজের নোটের ঝামেলা এড়িয়ে সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষকে নগদহীন (ক্যাশলেস) অর্থনীতিতে যুক্ত করতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই ব্যবস্থায় কোনো বাণিজ্যিক মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন হবে না। রিকশাচালক, বাস কন্ডাক্টর, ফুটপাতের হকার, সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে ভিক্ষুক বা সাহায্যপ্রার্থীরাও নিজেদের ব্যক্তিগত কিউআর কোডের মাধ্যমে সেকেন্ডের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবেন।

বাংলাদেশের এই সহজ ও উন্মুক্ত ওপেন-মডেলটি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল, মেটা ও হুয়াওয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং তারা এ বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

দৈনন্দিন কেনাকাটায় খুচরা টাকা বা ভাংতির সংকট একটি নিত্যদিনের বিড়ম্বনা। নতুন এই ব্যবস্থার ফলে ২৩ টাকা বা ৪৭ টাকার মতো সুনির্দিষ্ট অঙ্কের বিলও অ্যাপের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে পরিশোধ করা সম্ভব হবে। ফলে বাড়তি টাকা রেখে দেওয়া বা ২-৩ টাকার ভাংতির জন্য দাঁড়িয়ে থাকার ঝামেলা থাকবে না। পাশাপাশি বাজারে থাকা নোংরা ও ছেঁড়া নোট আদান-প্রদানের মানসিক অস্বস্তি থেকেও মুক্তি মিলবে।

নগদবিহীন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ডিজিটাল দান ও সাহায্য প্রদানের সুবিধা। খুচরা টাকা না থাকার অজুহাতে কাউকে ফিরিয়ে দিতে হবে না। সাহায্যপ্রার্থী বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যক্তিগত কিউআর কোড সামনে রাখলে যে কেউ ২, ৫ বা ১০ টাকার মতো ক্ষুদ্র অঙ্কও সরাসরি পাঠিয়ে দিতে পারবেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, এই ব্যক্তিগত কোডটি কেবল বৈধ লেনদেনে ব্যবহার করা যাবে; অননুমোদিতভাবে টাকা ক্যাশআউট করার চেষ্টা করলে অ্যাকাউন্ট তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।

ডিজিটাল লেনদেনে অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জের ভীতি দূর করতে মাশুল সম্পূর্ণ শূন্য (০ শতাংশ) নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, রিকশাচালককে ৩০ টাকা পাঠালে ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো বাড়তি টাকা কাটবে না এবং চালকও পুরো ৩০ টাকাই পাবেন। এই টাকা সরাসরি ও তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যাবে।

গ্রাহকদের সুবিধার কথা ভেবে দেশের সব ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাপের মূল পাতার নিচে বুড়ো আঙুলের নাগালের মধ্যে ‘বাংলা কিউআর’ আইকন রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে আগের দৈনিক ২০ হাজার টাকার লেনদেনসীমা তুলে নেওয়া হয়েছে। সরাসরি স্ক্যান করার পাশাপাশি গ্যালারি থেকে কিউআর কোডের ছবি বা স্ক্রিনশট আপলোড করেও লেনদেন করা যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে যেখানে বাংলা কিউআরে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৩৭ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিদিন গড়ে ১৪৩ থেকে ১৮০ কোটি টাকায়। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪০ লাখ ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠান এই সেবার আওতায় এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য, সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এই লেনদেন দ্রুত দৈনিক ৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা।

আন্তর্জাতিক ইএমভি (EMV) স্ট্যান্ডার্ড মেনে তৈরি হওয়ায় এটি নিরাপদ। তবে লেনদেনের সময় কিছু বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে
১. নাম যাচাই : স্ক্যান করার পর টাকা পাঠানোর আগে গ্রাহককে পর্দায় প্রাপকের নাম মিলিয়ে নিতে হবে।
২. এসএমএস বা ব্যালেন্স নিশ্চিতকরণ : বিক্রেতা বা চালকদের অন্যের ফোনের দিকে না তাকিয়ে নিজের ফোনে আসা মেসেজ বা অ্যাপ ব্যালেন্স দেখে লেনদেন নিশ্চিত করা উচিত।

আগামী ১ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক লেনদেনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রক্রিয়াকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে।

সময়ের আলো/জোই
১২ অক্টোবর, ২০২৬

আরও - জাতীয় সংবাদ

আরও - জেলা সংবাদ