সেই ২০০০ সাল থেকে স্বচ্ছতার সাথে পথচলা...

June 4, 2026 4:35 pm

ভরণপোষণের সঙ্গে মা-বাবার পরিচর্যাও আইনি দায়িত্ব

বৃদ্ধ মা-বাবার ভরণপোষণের পাশাপাশি তাদের নিয়মিত খোঁজখবর, চিকিৎসা ও পরিচর্যা নিশ্চিত করাও সন্তানের আইনি দায়িত্ব। ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’-এ এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার এক যুগের বেশি সময় পার হলেও সচেতনতার অভাব, সামাজিক সংকোচ ও অভিযোগ কম হওয়ার কারণে এর প্রয়োগ এখনও সীমিত বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।

গত রোববার রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকায় নিজ ফ্ল্যাট থেকে নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ বৃদ্ধা ওই নারীর পচাগলা ও পোকাধরা মরদেহ উদ্ধার করে। তবে মায়ের সঙ্গে একই বাসার পৃথক কক্ষে বসবাস করলেও মৃত্যুর বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করেননি তার মেয়ে।

প্রতিবেশীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি প্রায় একাকী জীবনযাপন করছিলেন। নুরজাহান বেগমের এক ছেলে যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান এবং অপর ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম আশিকুর রহমান। মেয়ে একটি স্কুলের শিক্ষিকা। দুই ছেলে আলাদাভাবে বসবাস করতেন এবং মায়ের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানদের এমন অবহেলার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে অবহেলার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যুগ্ম সচিব আনিসুর রহমানকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

আইনজীবীরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনার প্রেক্ষাপটে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’-এর বিধানগুলো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা এবং তাদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব নির্ধারণে আইনটি অত্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।

আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তার মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে পারস্পরিক আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো সন্তান তার মা-বাবাকে বা তাদের একজনকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রম কিংবা অন্য কোথাও একত্রে বা আলাদাভাবে বসবাসে বাধ্য করতে পারবেন না।

আইনে আরও বলা হয়েছে, সন্তানদের নিয়মিতভাবে মা-বাবার স্বাস্থ্য ও সার্বিক কল্যাণের খোঁজখবর রাখতে হবে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা, পরিচর্যা ও সঙ্গ নিশ্চিত করাও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এমনকি কোনো সন্তানের স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি এ দায়িত্ব পালনে বাধা দেন, তবে তারাও একই অপরাধে দায়ী হবেন এবং আইনের আওতায় শাস্তি পেতে পারেন।

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর ৩(৭) ধারা অনুযায়ী, কোনো পিতা বা মাতা সন্তানদের সঙ্গে বসবাস না করে আলাদাভাবে থাকলে তাদের প্রত্যেক সন্তানকে নিজের আয়-উপার্জন থেকে যুক্তিসংগত পরিমাণ অর্থ নিয়মিতভাবে মা-বাবাকে দিতে হবে।

আইন অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধের বিচার প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হবে। তবে বাবা বা মায়ের লিখিত অভিযোগ ছাড়া আদালত সাধারণত এ অপরাধ আমলে নিতে পারবেন না। আইনটিতে আপস-মীমাংসার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর ৫(১) ধারা অনুযায়ী, অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত সন্তানকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। জরিমানা অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার এক যুগ পার হলেও দেশে এ আইনের ব্যবহার এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত।

আইনটির আলোকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ বিধিমালা’ প্রণয়ন করে। বিধিমালায় সন্তানদের মা-বাবার সঙ্গে বসবাস, তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রমে না পাঠানোর বিষয়গুলো আরও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো সন্তান যদি বাস্তব কারণে মা-বাবাকে নিজের কাছে রেখে ভরণপোষণ করতে না পারেন, তবে সরকারি বা বেসরকারিভাবে পরিচালিত পরিচর্যাকেন্দ্রে তাদের পরিচর্যার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আবার কোনো প্রবীণের জীবিত সন্তান না থাকলে কিংবা ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ না থাকলে পিতা-মাতা ভরণপোষণ কমিটি তাদের পরিচর্যাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। এছাড়া অসহায় মা-বাবার সহায়তায় সরকারি অনুদান ও দেশি-বিদেশি সহায়তার মাধ্যমে একটি ‘ভরণপোষণ তহবিল’ গঠনেরও রূপরেখা দেওয়া হয়েছে বিধিমালায়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী বৃদ্ধ মা-বাবাকে শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; তাদের নিয়মিত দেখাশোনা, খোঁজখবর নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যার দায়িত্বও সন্তানদের ওপর বর্তায়। সপ্তাহে অন্তত একবার তাদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করা, তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া সন্তানের নৈতিক ও আইনি দায়িত্বের অংশ।

তিনি বলেন, মিরপুরের ঘটনায় যা ঘটেছে, তা শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, বিশেষ করে মুসলিম সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়েরও প্রতিফলন। একজন মা সন্তানদের মানুষ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, অথচ জীবনের শেষ সময়ে এমন অবহেলার শিকার হয়েছেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক।

ব্যারিস্টার সরোয়ার হোসেনের মতে, শিক্ষিত ও উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত মানুষদের কাছ থেকে সমাজ আরও বেশি মানবিক আচরণ প্রত্যাশা করে। কিন্তু কেউ যদি শিক্ষিত হয়েও মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তা হলে তা সমাজের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে। এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সামাজিকভাবেও নিন্দা ও ধিক্কার জানানো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে চাকরি ও ব্যক্তিগত সংসারের ব্যস্ততার অজুহাতে কিংবা পারিবারিক প্রভাবের কারণে বাবা-মা অবহেলার শিকার হন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই এ দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যেহেতু এটি ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, তাই এ ধরনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত।

সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী মনজিল মোরশেদ সময়ের আলোকে বলেন, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনটি অত্যন্ত যুগোপযোগী ও মানবিক একটি আইন। তবে আইনটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা এখনও পর্যাপ্ত নয় এবং এর প্রচারও সীমিত।

তিনি জানান, এ আইনের আওতায় ইতিমধ্যে কয়েকটি মামলা হয়েছে। চাঁদপুরে একটি মামলা হয়েছে। ঢাকায় এক বৃদ্ধা নারীর পক্ষে তিনি নিজেও একটি জনস্বার্থ মামলা করেছিলেন, যেখানে একজন চিকিৎসক ছেলে তার মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করছিলেন না। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকটি মামলার নজির রয়েছে।

মনজিল মোরশেদ বলেন, অনেক প্রবীণ বাবা-মা সামাজিক মর্যাদা বা পারিবারিক সম্পর্কের কথা বিবেচনা করে আদালতের দ্বারস্থ হতে চান না। ফলে আইন থাকার পরও অনেক ঘটনা অপ্রকাশিত থেকে যায়। অথচ গত কয়েক দশকে সমাজব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগে সন্তানরা মা-বাবার ভরণপোষণকে স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করলেও বর্তমানে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার ফলে পারিবারিক সম্পর্কের দূরত্ব বেড়েছে। অনেক সময় ছেলের স্ত্রীর সঙ্গে বিরোধ বা পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণেও বাবা-মা অবহেলার শিকার হন। এসব বাস্তবতায় আইনটির কার্যকর প্রয়োগ আরও জরুরি হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন তিনি।

সরকারের অবস্থান প্রসঙ্গে মনজিল মোরশেদ বলেন, এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক। তবে যেসব প্রবীণ বাবা-মা এমন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, তাদের আইনের আশ্রয় নেওয়া উচিত। অভিযোগ দায়ের করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে আইনটি নিয়ে আরও ব্যাপক প্রচার চালানো প্রয়োজন, যাতে সাধারণ মানুষ তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন।

অলিউল ইসলাম
সময়ের আলো/আআ
৪ জুন, ২০২৬

 

আরও - জেলা সংবাদ

আরও - লাইফ স্টাইল সংবাদ

আরও - ভিন্ন খবর