-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
সাগরপথে ইতালি ও গ্রিসে যাওয়ার শীর্ষে বাংলাদেশ
লিবিয়া থেকে মিয়ানমার : সামাজিক মাধ্যমে ফাঁদ পেতে চলছে পাচারকারীদের রমরমা বাণিজ্য। ছবি : সংগৃহীত
ইউরোপে পৌঁছানোর অদম্য বাসনা কিংবা বিদেশে লোভনীয় উপার্জনের আশা-দুই পথেই জীবন বাজি রেখে পাচারকারীদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন অগণিত বাংলাদেশি। আজ ৩০ জুলাই (বৃহস্পতিবার) ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’ বার্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস পালিত হচ্ছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে, যখন সামাজিক মাধ্যম ও আধুনিক প্রযুক্তিকে হাতিয়ার বানিয়ে দালাল চক্রগুলো তরুণদের সমুদ্রের প্রাণঘাতী তরঙ্গে কিংবা বিদেশি স্ক্যাম কম্পাউন্ডের বন্দিদশায় ঠেলে দিচ্ছে।
সীমান্ত সুরক্ষা সংস্থা ফ্রন্টেক্স ও উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অনিয়মিত উপায়ে ইতালি ও গ্রিসে প্রবেশের তালিকায় বাংলাদেশ এখন শীর্ষে। ২০২৫ সালে ২০ হাজার ২৫৯ জন এবং ২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসে ৪ হাজার ২৪৯ জন বাংলাদেশি সাগরপথে ইতালি ঢুকেছেন। একই সময়ে লিবিয়া উপকূল হয়ে গ্রিসে গেছেন আরও ৩ হাজার ৬০৮ জন। জীবনের ভয় উপেক্ষা করেই মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ ১০-১২টি জেলার ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী যুবকেরা এই বিপজ্জনক পথ বেছে নিচ্ছেন। গত মার্চের ২১ তারিখে লিবিয়ার তোবরুক থেকে ছাড়ার পর দিক হারানো এক নৌকায় পানির অভাবে ১৮ জন মারা যান, যাদের ১২ জনই সুনামগঞ্জের। মৃতদেহগুলো সাগরে ভাসিয়ে দেয় পাচারকারীরা। তাছাড়া লিবিয়ার আস্তানায় জিম্মি রেখে নির্যাতন এবং পরিবারের কাছ থেকে ২৫-৩০ লাখ টাকা আদায়ের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।
অন্যদিকে, সাইবার স্ক্যাম এখন পাচারের এক নতুন রূপ নিয়ে সামনে এসেছে। কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারের মতো দেশগুলোতে আকর্ষণীয় পদের ফাঁদে ফেলে তরুণদের জিম্মি করা হচ্ছে। বিএমইটির তথ্যমতে, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন কম্বোডিয়া গেলেও তাদের বড় অংশই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ পাননি। গত জুনে স্থানীয় অভিযানে সেখান থেকে ৫৮৩ জন বাংলাদেশি উদ্ধার হয়ে দেশে ফেরেন। তাদের ৯৮ শতাংশ জানান নিয়োগ প্রতিশ্রুতি ভুয়া ছিল, আর ৯০ শতাংশকে বলপ্রয়োগ করে অনলাইন জালিয়াতিতে খাটানো হয়। কোড নম্বরে পরিচিত হতে হওয়া এসব ভুক্তভোগীদের ওপর চালানো হতো ভয়াবহ নির্যাতন। একইভাবে মিয়ানমার থেকেও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ১৮ জন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৮ জন বাংলাদেশি উদ্ধার হয়েছেন।
এছাড়া, রাশিয়ায় ওয়েল্ডার বা নিরাপত্তারক্ষীর কাজের প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে মানবঢাল বানানোর গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। রুশ ভাষার চুক্তিপত্রে সই করিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণের পর সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে, যেখানে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। পাশাপাশি দুবাই, সৌদি আরব বা মালয়েশিয়ায় গৃহকর্মী বা পার্লার কর্মীর প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের যৌন ব্যবসায় বাধ্য করা হচ্ছে। পটুখালীর লিজা আক্তার, নোয়াখালীর পহেলী আক্তার কিংবা বিধবা সাহারা বেগমের ১৭ বছরের মেয়ে জান্নাতের মতো অনেকে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় এলাকায় বিয়ে ও চাকরির লোভে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি টেকনাফের স্থানীয় অধিবাসীদের অপহরণ করে ট্রলারে ভাসিয়ে মালয়েশিয়া পাচারের ঘটনাও ঘটছে।
আইনি সুরক্ষার চিত্রও হতাশাজনক। বিমানবন্দরে প্রতিবছর ৮০ থেকে ৯০ হাজার মানুষ খালি হাতে ফেরেন। ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত আদালতে ৫ হাজার ২৮৪টি পাচার মামলা ঝুলে রয়েছে, যার ৩ হাজার ৩০৬টি বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টি তদন্তাধীন। আসামিদের খালাস পাওয়ার প্রবণতাই বেশি। সম্প্রতি সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ অনুমোদন করলেও বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ।
এ বিষয়ে ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, প্রযুক্তি ব্যবহারে পাচারকারীরা এগিয়ে থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুটা পিছিয়ে। পাচার রুখতে আইনের কঠোর প্রয়োগ, অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং সমন্বিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।
সময়ের আলো/আরবিএন
৩০ জুলাই, ২০২৬