সেই ২০০০ সাল থেকে স্বচ্ছতার সাথে পথচলা...

November 3, 2026 1:01 pm

পাথরের স্তূপে মিলল ১০ লাখ ডলারের হীরা

আমেরিকার আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের ক্রেটার অফ ডায়মন্ডস স্টেট পার্কে চলতি বছরের শুরুর দিকে বন্ধুকে নিয়ে হীরা খুজতে গিয়েছিলেন জ্যাক। সেদিন তারা দুই জন মিলে একটি বালতি ভর্তি নুড়ি-পাথর সংগ্রহ করেন। এরপর সেই পাথর ধোয়া ও বাছাই করার পালা। একপর্যায়ে বালতির পাথরগুলো টেবিলের ওপর উল্টে দিতেই চোখে পড়ে চকচকে একটি বস্তু। প্রথমে যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না জ্যাক। একটু ভালো করে দেখতেই বোঝা গেল, এ তো আর সাধারণ কোনো পাথর নয়। একেবারে আস্ত একটি হীরা।

আমেরিকান নৌ বাহিনীর রিজার্ভ সদস্য জ্যাক পিয়ারাডিন। ১২ বছরের বেশি সময় ধরে পাথর ঘেটেছেন, মাটি খুড়েছেন, নুড়ি বেছেছেন। কিন্তু শখের এই অনুসন্ধান থেকে তেমন কোনো বড় প্রাপ্তি ছিল না। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান। সন্ধানের সেই মুহূর্তটি টিকটকে সরাসরি সম্প্রচার করছিলেন তিনি। হীরাটি চোখে পড়তেই উচ্ছ্বাসে চিৎকার করে ওঠেন, ‘ওহ মাই গড! ওহ মাই গড! কি দারুণ! আমরা বিশাল একটা পেয়েছি!’ তার আনন্দ আর বিস্ময় মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সোশাল মিডিয়ায়। নখের কাছাকাছি আকারের এই হীরার ওজন ছয় দশমিক শূন্য তিন ক্যারেট। চলতি বছর ওই পার্কে পাওয়া সবচেয়ে বড় হীরাও এটি।

তবে জ্যাকের কাছে হীরাটি কেবল মূল্যবান একটি রত্ন নয়, এটি তার দীর্ঘদিনের সাধনার পুরস্কার। তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘আমেরিকান ডৃম’। সংগ্রাহকদের কাছ থেকে শুনেছেন, হীরাটির দাম ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ১২ কোটি টাকার বেশি। যদিও এই মূল্য এখনো চূড়ান্ত নয়। লিটল রকের প্রত্যয়িত রত্ন মূল্যায়নকারী লরা স্ট্যানলির হিসাবে, উচ্চমানের ছয় ক্যারেটের একটি হলুদ হীরার দাম হতে পারে প্রায় আড়াই লাখ ডলার। অর্থাৎ, জ্যাকের শোনা দামের চেয়ে কম হলেও এই আবিষ্কার যে অসাধারণ, তাতে সন্দেহ নেই।

হীরার সন্ধানে জ্যাকের এই দীর্ঘ পথচলা শুরু ২০১৩ সালে। মূল বাড়ি মিসৌরিতে হলেও শখের টানে তিনি চলে আসেন আরকানসাসের কাছাকাছি মারফৃসবোরো এলাকায়। কারণ, সেখানেই রয়েছে তার স্বপ্নের ঠিকানা। নিজের শখের প্রতি ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে জ্যাক বলেছেন, ‘আমি এটাকে এতটাই ভালোবাসি যে, এর জন্যই এখানে চলে এসেছি।’ এত দিনে ওই পার্ক থেকে ৩০০টির বেশি রত্ন খুজে পেয়েছেন তিনি। এর বেশির ভাগই অনলাইনে বিক্রি করেছেন।
যে পার্কে জ্যাকের ভাগ্য খুলেছে, সেটির ইতিহাসও বেশ চমকপ্রদ। ১৯৭২ সালে সাবেক উন্মুক্ত হীরার খনিটিকে স্টেট পার্ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে সেখানে ৩৭ হাজারের বেশি হীরা পাওয়া গেছে। পার্কে প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ১৫ ডলার ফি দিতে হয়। দর্শনার্থীরা পাচ গ্যালনের একটি বালতি ভর্তি পাথর সংগ্রহ করে সেগুলোর মধ্যে হীরা কিংবা অন্য কোনো রত্ন খুজতে পারে। মজার ব্যাপার হলো, যা পাওয়া যাবে, তা নিজের কাছেই রাখা যাবে। অর্থাৎ, খুজে পাওয়া হীরার মালিকানা নিয়ে পার্ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভাগাভাগির ঝামেলাও নেই।

পার্কটির কর্মকর্তা সারাহ বিভেন্স জানান, প্রতি বছর সেখানে প্রায় ৪০০-৮০০টি হীরা পাওয়া যায়। তবে অধিকাংশ হীরার ওজন এক-চতুর্থাংশ ক্যারাটের মতো। পার্কটির সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট ওয়েমন কক্স জানান, এর আগেও সেখানে বেশ বড় হীরা পাওয়া গেছে। ২০২০ সালে আরকানসাসের এক ব্যাংক ম্যানেজার পেয়েছিলেন নয় ক্যারেটের হীরা। ২০২৪ সালে ফ্রান্সের এক পর্যটক পান সাত দশমিক ৪৬ ক্যারেটের একটি হীরা।

এই পার্কের সবচেয়ে বিখ্যাত আবিষ্কার ‘আঙ্কল স্যাম’। ১৯২৪ সালে পাওয়া ৪০.২৩ ক্যারেটের এই হীরাটি আমেরিকায় এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় হীরা। পরে সেটি কেটে ও পলিশ করে ১২.৪২ ক্যারেটের একটি হীরায় রূপ দেয়া হয়। বর্তমানে এটি স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্টৃতে ‘গ্রেট আমেরিকান ডায়মন্ডস’ প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।

হীরা অবশ্য পৃথিবীর সর্বত্র পাওয়া যায় না। ভূগর্ভের গভীরে প্রচণ্ড তাপ ও চাপে তৈরি হয় এই মূল্যবান রত্ন। পরে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে তা ভূপৃষ্ঠে উঠে আসে। বৃষ্টি, পানি ও বাতাসের প্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন স্থানে। জেমোলজিকাল ইন্সটিটিউট অফ আমেরিকার সিনিয়র ম্যানেজার নাথান রেনফ্রো জানান, আমেরিকায় হীরার দুটি পরিচিত প্রাথমিক প্রাকৃতিক ভান্ডার রয়েছে। একটি আরকানসাসের ক্রেটার অফ ডায়মন্ডস, অন্যটি কলোরাডোর কেলসি লেক। তবে সেখানে বাণিজ্যিক খনন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের নিজের হাতে হীরা খুজে পাওয়ার সুযোগ এখন প্রায় একমাত্র এই আরকানসাস পার্কেই রয়েছে। রেনফ্রোর ভাষায়, সাধারণ মানুষের জন্য এমন সুযোগ সত্যিই অসাধারণ। কারণ, বিশ্বের অধিকাংশ হীরার খনিতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশের সুযোগ নেই।

জ্যাক তার নতুন আবিষ্কারের সম্ভাব্য আয় একা ভোগ করতে চান না। হীরাটি খুজে পাওয়ার সময় তার সঙ্গে ছিলেন উইসকনসিনের বন্ধু মাইকেল শুমাখার। দুই জন মিলে বালতিটি ভর্তি করেছিলেন। তাই হীরা বিক্রির অর্থও বন্ধুর সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান জ্যাক। শুধু তা-ই নয়, ভবিষ্যতে নিজের একটি কৃস্টাল খনি চালুর স্বপ্নও দেখছেন তিনি।

১২ বছরের অপেক্ষা, অসংখ্য পাথর ঘাটা আর নিরাশার পর অবশেষে জ্যাকের হাতে ধরা দিয়েছে তার ‘আমেরিকান ডৃম’। এখন অপেক্ষা, স্বপ্নের এই হলুদ হীরাটি শেষ পর্যন্ত কত দামে বিক্রি হয়। তবে দাম যা-ই হোক, একটি বিষয় নিশ্চিত— পাথরের স্তূপে যে ভাগ্যও ঝলমল করতে পারে, জ্যাক পিয়ারাডিনের গল্প তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
পাথরের স্তূপ থেকে উঠে আসা ছয় দশমিক শূন্য তিন ক্যারেটের ঝকঝকে হলুদ হীরা পাওয়ার আনন্দে জ্যাকের উচ্ছ্বাস যেন বাধ মানছিল না।

তথ্যসূত্র :এপি
০3 নভেম্বর ২০২৬

আরও - আন্তর্জাতিক সংবাদ

আরও - ভিন্ন খবর

আরও - লাইফ স্টাইল সংবাদ