-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
আদম ব্যবসার আড়ালে সৌদিতে নারী পাচার
বিদেশে কর্মী পাঠানোর আড়ালে সৌদি আরবে নারী পাচারের ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে ‘অপরাজিতা ওভারসিস’ নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, সৌদি প্রতিনিধিদের মনোরঞ্জনের জন্য অফিসের নারী কর্মীদের বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় সরকারি খরচের চেয়ে দ্বিগুণ টাকা নিয়ে লোক পাঠানোর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়াসহ একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৯ জুলাই অপরাজিতা ওভারসিসের (আরএল ১৩১৮) বাতিল করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ওমান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, রোমানিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠায় অপরাজিতা ওভারসিস। ২০২৩ সাল থেকে ইউরোপের কাজের সঙ্গে জড়িত হওয়ার প্রসঙ্গে ‘রাবিড’ (রিক্রুটিং এজেন্সি অ্যাসোশিয়েশন অব বাংলাদেশ ইউরোপ অ্যান্ড ডেভেলপ কান্ট্রি) নামে একটি পরিষদও চালু করেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. আরিফুর রহমান। যার মাধ্যমে বাজার থেকে পাসপোর্টের টাকা কালেকশন করার সুযোগ পায় তিনি। সেই সুযোগে ভিসার কথা বলে মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া আইনের তোয়াক্কা না করে বিএমইটির কার্ড ছাড়াই শত শত নারীকে অবৈধভাবে এয়ারপোর্ট কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে সৌদি আরবে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরিুদ্ধে।
সময়ের আলোর হাতে থাকা নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ২৮ মার্চ ‘ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সে’ মোস্মা. রোজিনা নামে (২২) এক নারীকে সৌদি আরব পাঠান আরিফুর রহমান। যার পাসপোর্ট নং (এ০৬৪০৯০৯৩)। এ ছাড়া ২৭ মার্চ কবিতা নামে আরও এক নারীকে ‘হিমালয়ান এয়ারলাইন্সে’পাঠানো হয় যার পাসপোর্ট নং (এ০৫০৩০১৮৭)। এর পরের এপ্রিল মাসে একই এয়ারলাইন্সে করে আরও চার নারীকে একইভাবে সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে। এরা হলেন ওজালা (পাসপোর্ট-এ-০৫২৮৫৭৫৮৫), সাবনুর (এ-০৪২৫২৯৬৩), মোসাম্মাত আকলিমা (এ-০৬৪২৩০৯৮), মোসা. ইয়াসমিনা (এ-০৬২৫৪৮৪৪)।
এরপর একই বছরের জুন মাসের ১১ তারিখে মোসা. লাভলী নামে এক নারীকে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সে করে সৌদিতে পাঠানো হয়েছে। এর বাইরেও আরও শতাধিক নারীকে একইভাবে অবৈধভাবে বিদেশ পাঠিয়েছে অপরাজিতা ওভারসিস। যাদের বয়স ১৮ থেকে ২০ এর মধ্যে। জানা গেছে, ২০২৩ সালে ইমিগ্রেশনের দায়িত্বে থাকা মো. এনামুল নামে এক কর্মকর্তার মাধ্যমে এ কাজগুলো করিয়েছে আরিফুর রহমান।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩ অনুযায়ী বিএমইটি স্মার্ট কার্ড ছাড়া কোনো কর্মী বিদেশ পাঠানো দণ্ডনীয় অপরাধ। কোনো এজেন্সির যদি কার্ড ছাড়া কর্মী পাঠায়, তবে তাদের লাইসেন্স বাতিল, জামানত বাজেয়াপ্ত এবং মোটা অঙ্কের জরিমানা হতে পারে। তথাকথিত এয়ারপোর্ট কন্ট্রাক্ট সম্পূর্ণ অবৈধ ও এটি মূলত মানব পাচারের একটি কৌশল। বিএমইটি কার্ড থাকলে সরকারের কাছে ওই কর্মীর আঙুলের ছাপ, জীবনবৃত্তান্ত এবং নিয়োগকর্তার (কফিল) বিস্তারিত তথ্য জমা থাকে। বিএমইটি কার্ড থাকলে কর্মীরা বাধ্যতামূলক জীবন বীমার আওতায় থাকেন। বিদেশে কোনো দুর্ঘটনা বা মৃত্যু হলে পরিবার আর্থিক সহায়তা পায়। আর কার্ড ছাড়া কোনো কর্মী বিদেশ গেলে কর্মীর কোনো তথ্য সরকারের ডাটাবেজে থাকে না। ফলে সৌদি আরবে কোনো বিপদে পড়লে বাংলাদেশ দূতাবাস চাইলেও দ্রুত আইনি সহায়তা দিতে পারে না, কারণ সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী ওই ব্যক্তি ‘কর্মী’ হিসেবে দেশত্যাগ করেননি।
শুধু সৌদিতে নারী পাচারই নয়, সৌদি থেকে কোনো সৌদিয়ান রিপ্রেজেনটেটিভ বা প্রতিনিধি বাংলাদেশে এলে তাদের মনোরঞ্জনের জন্য অফিসের নারী কর্মীদের বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে আরিফুরের বিরুদ্ধে। কোনো নারী এতে রাজি না হলে তার বিরুদ্ধে মামলাসহ নানা হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির মালিক আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে। তার এসব কার্যকলাপ নিয়ে গত ১৪ মে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ করেন এলিনা জামান সৃষ্টি (৩০) নামে তার অফিসের এক নারী কর্মী। ওই অভিযোগপত্রে এলিনা বলেন, আমি অপরাজিতা ওভারসিস নামের ওই প্রতিষ্ঠানে ২০২৩ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় আট মাস কর্মরত ছিলাম। এই সময়কালে প্রতিষ্ঠানটির মালিক আরিফুর রহমানের বিভিন্ন রকম অনৈতিক ও আইনবিরোধী কাজগুলো সম্পর্কে জানতে পারি এবং একই কাজগুলো করার জন্য আমাকেও চাপাচাপি করা হয় এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। আরিফুর রহমান বিভিন্ন সময়ে আমাকে তার ব্যবসায়িক ক্লায়েন্টদের মনোরঞ্জন করার জন্য মানসিক চাপ দেওয়া শুরু করে। এক পর্যায়ে আমি অসুস্থ হয়ে কয়েক দিন অনুমতি নিয়ে বাসায় থাকি। তার দেওয়া কুপ্রস্তাবে রাজি না হলে আমি ও আমার পরিবারসহ সবাইকে বিভিন্ন মামলায় গত দুই বছর ধরে একের পর এক হেনস্থা করে যাচ্ছে। কিন্তু সিআইডিসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনে তার দেওয়া মামলাগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে আমি ও আমার পরিবারের সবাই তাদের দ্বারা জীবন নষ্ট ও প্রাণহানির হুমকির মুখে রয়েছি।
শুধু নারী পাচারই নয়, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারি খরচের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আরিফুরের বিরুদ্ধে। মালয়েশিয়ায় সরকারিভাবে কর্মী পাঠাতে যেখানে খরচ হয় ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। আর আরিফুর কোম্পানির ভিসায় নিতেন ১ লাখ ৫০ হাজার ও কৃষি ভিসায় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এ ছাড়াও বিভিন্ন এজেন্সি থেকে মালয়েশিয়ার কেনা কাজগুলোর জন্য নিতেন পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা।
গত ১৯ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনে অপরাজিতা ওভারসিসসহ ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে রিক্রুটিং এজেন্সির অনুকূলে ইস্যুকৃত লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান আইন ২০১৩ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) আইন ২০২৩ এবং সংশ্লিষ্ট সব আইন ও বিধিবিধান পালনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এই ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে দ্য পেনাল কোড-১৮৬০ এর ৪০৬, ৪২০, ৩৮৫, ৩৮৬, ৪২৭, ৩৪ ধারায় আদালতে অভিযোগপত্র দায়ের ও গৃহীত হয়েছে।
পেনাল কোড ১৮৬০-এর ৪০৬ ধারা অনুযায়ী অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ বা অর্থ/সম্পত্তি আত্মসাতের শাস্তি (সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয়ই)। ধারা-৪২০ হলো প্রতারণা করা এবং প্রতারিত করে কারও কাছ থেকে জোরপূর্বক সম্পত্তি বা মূল্যবান দলিল আদায় করা (সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা)। ধারা-৩৮৫ হলো কোনো ব্যক্তিকে আঘাত বা ক্ষতির ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক অর্থ বা সম্পত্তি আদায়ের চেষ্টা করা। ধারা-৩৮৬ হলো কোনো ব্যক্তিকে মারাত্মক আঘাত বা মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক মূল্যবান সম্পত্তি আদায় করা। ধারা-৪২৭ হলো ৫০ টাকা বা তার বেশি ক্ষতিসাধন করে কোনো ধরনের ক্ষতি বা নষ্ট করা। ধারা ৩৪ অনুযায়ী একাধিক ব্যক্তি একত্রে সমব্যথী বা অভিন্ন উদ্দেশ্যে কোনো অপরাধ করলে সবার সমান অপরাধ বা দায়বদ্ধতা বোঝায়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মো. আরিফুর রহমানকে ফোন দিলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলে সাড়া দেন তিনি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি অভিযোগকারী এলিনা জামানের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করতে বলেন। এরপর তিনি লিখিত প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। তথ্য প্রমাণসহ লিখিত প্রশ্ন পাঠালে তিনি জানান, তিনি তার উকিলের সঙ্গে কথা বলে মন্তব্য করবেন। পরের দিন তার কাছে আবারও মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোনো সাড়া দেননি। এ বিষয় কথা বলতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুরকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
শাকিল আহমেদ
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আরবিএন
৩০ জুলাই, ২০২৬