-
Facebook
-
Twitter
-
Linkedin
ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম কী, কেন পালন করা হয়?
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মহান মনীষী রয়েছেন, যাদের জীবন, জ্ঞান, সাধনা ও দ্বীনি খেদমত যুগের পর যুগ মানুষকে সত্য ও সঠিক পথে চলার অনুপ্রেরণা দিয়ে আসছে। তাদেরই একজন কাদেরিয়া সুফি ধারার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব, প্রখ্যাত আলেম ও আধ্যাত্মিক সাধক হজরত শেখ আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)। মুসলিম বিশ্বে তিনি ‘গাউসুল আজম’ ও ‘বড়পীর’ নামে সুপরিচিত।
বিশ্বজুড়ে সুফি অনুসারী ও ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের কাছে হিজরি রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখটি ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধাপূর্ণ ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। এ উপলক্ষে হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জীবন, দ্বীনি অবদান ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার আলোচনা করা হয়। কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ, দোয়া, দান-সদকা এবং ইসালে সওয়াবের মাধ্যমে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়।
‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ নামের অর্থ
‘ফাতিহা’ ও ‘ইয়াজদহম’-দুটি ফারসি শব্দের সমন্বয়ে নামটি গঠিত। ‘ফাতিহা’ বলতে সাধারণভাবে দোয়া, মোনাজাত কিংবা কোনো মরহুম বা বুজুর্গ ব্যক্তির রুহের মাগফিরাত ও মর্যাদা কামনায় কুরআন তিলাওয়াত করে ইসালে সওয়াব করাকে বোঝানো হয়। আর ‘ইয়াজদহম’ ফারসি শব্দ, যার অর্থ এগারো।
অর্থাৎ, ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ বলতে ১১ তারিখের ফাতিহাকে শরিফকে বোঝানো হয়। এই ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম শরিফ আবদুল কাদের জিলানী এর স্মরণে পালিত হয়। হিজরি রবিউস সানি মাসের ১১তম দিনে আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ইন্তেকাল করেন। তাই প্রতি বছর এই বিশেষ দিনে তার স্মরণে আয়োজিত ইসালে সওয়াব ও মোনাজাতের মাহফিলকে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ বলা হয়। সে হিসেবে এ বছর ২৩ সেপ্টেম্বর, বুধবার যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে দিবসটি পালিত হবে।
হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জীবন
প্রচলিত ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ৪৭০ হিজরি, অর্থাৎ ১০৭৮ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের জিলান অঞ্চলের কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী একটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতৃসূত্রে হজরত হাসান (রা.) এবং মাতৃসূত্রে হজরত হোসাইন (রা.)-এর বংশধর ছিলেন বলে বর্ণিত আছে।
শৈশব থেকেই তার মধ্যে জ্ঞানার্জনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল। উচ্চতর দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম জ্ঞানকেন্দ্র বাগদাদে গমন করেন। সেখানে সময়ের বিশিষ্ট আলেমদের কাছ থেকে তিনি তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও আরবি সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন।
তিনি ছিলেন জ্ঞানী আলেম, ফকিহ ও আধ্যাত্মিক সাধক। দ্বীনি জ্ঞান ও আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন জ্ঞানশাস্ত্রেও তার ব্যাপক আগ্রহ ছিল। তার জীবন ও শিক্ষার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল কুরআন-সুন্নাহর প্রতি গভীর আনুগত্য এবং মানুষকে আল্লাহর পথে ফিরে আসার আহ্বান।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা তার নেককার বান্দাদের মর্যাদা সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন-
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
‘জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর অলিদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।’ (সুরা ইউনুস : ৬২)
বাগদাদে হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর ওয়াজ, দরস ও নসিহত মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। তার জ্ঞানগভীরতা, প্রজ্ঞা ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা বহু মানুষকে দ্বীনের পথে অনুপ্রাণিত করে। তার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ ইসলাম ও নৈতিক জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে বলে বর্ণিত হয়।
কাদেরিয়া তরিকা ও তার রচনাবলি
হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) কাদেরিয়া সুফি ধারার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে এই ধারা তার নামের সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করে। তাসাউফের জগতে তার প্রভাব ব্যাপক। আধ্যাত্মিক সাধনা, আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা এবং সুন্নাহ অনুসরণের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
তার নামে প্রচলিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘গুনিয়াতুত তালিবিন’, ‘ফাতহুল গাইব’, ‘আল-ফাতহুর রাব্বানি’ এবং ‘কাসিদায়ে গাউসিয়া’। এসব রচনায় আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, দ্বীনি জীবন ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।
ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম কীভাবে পালন করা হয়?
রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে অনেক মুসলিম সমাজে হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর স্মরণে বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজন করা হয়। কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ পাঠ, তার জীবন ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা, দান-সদকা এবং মোনাজাতের মাধ্যমে ইসালে সওয়াব করা হয়।
মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও সদকার গুরুত্ব ইসলামী শিক্ষায় সুপ্রতিষ্ঠিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ: إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
‘মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার তিনটি আমল ছাড়া সব আমল বন্ধ হয়ে যায়- সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম ৪২০৫)
তবে কোনো ধর্মীয় আয়োজনের ক্ষেত্রে অপচয়, অপ্রয়োজনীয় আড়ম্বর কিংবা এমন কোনো আনুষ্ঠানিকতা থেকে বিরত থাকা উচিত, যা ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাহ্যিক আয়োজনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সংশ্লিষ্ট মনীষীর জীবন ও শিক্ষা থেকে বাস্তব শিক্ষা গ্রহণ করা।
ফাতিহা-ই-ইয়াজদহমের প্রকৃত শিক্ষা
হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জীবন থেকে সততা, আমানতদারিতা, তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের শিক্ষা গ্রহণ করা যায়।
‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ পালনের আসল বার্তাটি কেবল বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে মিলাদ বা দোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং একজন মহান আলেম ও আধ্যাত্মিক সাধকের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে সত্যবাদিতা, উত্তম চরিত্র, আল্লাহভীতি এবং সুন্নাহনিষ্ঠ জীবন গড়ে তোলার মধ্যেই তার স্মরণকে অর্থবহ করা সম্ভব।
উল্লেখ্য, হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ৫৬১ হিজরির ১১ রবিউস সানি, ১১৬৬ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদে ইন্তেকাল করেন বলে প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। বাগদাদেই তার মাজার অবস্থিত।
সময়ের আলো/মহু
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬